দেবযানী সরকার, কলকাতা: ভোটের আগে বিরোধীদের একের পর এক হুমকি দিয়েছেন৷ তাঁর ‘বিখ্যাত’ ডায়লগ পাঁচনের বাড়ি, চড়াম-চড়াম, গুড় বাতাসা, নকুলদানা-সেইসময় তুমুল বিতর্কের ঝড় তুলেছিল রাজ্য রাজনীতিতে৷ কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর আর তেমন আর হুঙ্কার ছাড়তে দেখা যাচ্ছে না বীরভূমে তৃণমূলের দোর্দন্ডপ্রতাপ অনুব্রত মণ্ডলকে৷ অনেকেই জেনে অবাক হবেন, সংবাদমাধ্যমকে এখন খানিকটা এড়িয়ে চলছেন অনুব্রত৷ উত্তরও দিচ্ছেন খুব সাবধানে৷ অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন, হঠাৎ হলটা কি দিদির ‘কেষ্টা’র? কৌতুহল বাড়ছে রাজ্য-রাজনীতিতে৷

অনেকেই অনুব্রত মণ্ডলকে কু-কথার ‘স্টার-পারফর্মার’ বলেন৷ যাঁরা যতই তাঁর সমালোচনা করুন, বিরোধী দল ও পুলিশকে হুমকি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি একাই একশো৷ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকেও তিনি পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন৷ কিন্তু কিছুদিন ধরে সেই চেনা মেজাজে আর যেন দেখা যাচ্ছেই না বীরভূমে তৃণমূলের জেলা সভাপতিকে৷

ইতিমধ্যেই তাঁর জেলায় ‘অপারেশন অনুব্রত’শুরু করে দিয়েছেন বিজেপি’র বাংলার স্ট্র্যাটেজিস্ট মুকুল রায়৷ একসময় অনুব্রতর টিমের মণিরুল ইসলাম, গদাধর হাজরা থেকে নানুরের পুরোনো খেলোয়াড় নিমাই দাসকে বিজেপিতে টেনে নিয়েছেন মুকুল৷ সম্প্রতি দুবরাজপুরে তৃণমূলের শহর সভাপতি প্রভাত চট্টোপাধ্যায়ও গেরুয়া শিবিরে নাম লিখিয়েছেন৷ এমনকি কেউ কেউ হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন অনুব্ত মণ্ডলও নাকি বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন৷ যদিও তাঁর ব্যাপারে যে সব মিথ্যে রটানো হচ্ছে কালীঘাটে গিয়ে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সে-কথা বুঝিয়ে এসেছেন কেষ্টা৷

২৩ মে বীরভূমের পাশাপাশি গোটা রাজ্যে তৃণমূলের সার্বিক ফল খারাপ দেখে অনুব্রত বলেছিলেন কয়েকদিন তিনি রাজনীতি থেকে বিশ্রাম নেবেন৷ অসুস্থ স্ত্রীকে সময় দেবেন৷ মেয়ের বিয়ের কথা ভাববেন৷ তারপর থেকেই সেভাবে দলীয় কর্মসূচিতে সেই দশাসই চেহারার মানুষটিকে দেখা যাচ্ছিল না৷ বীরভূমে কী তাঁর উপর মুকুল রায় খুব চাপ বাড়াচ্ছেন? সাবধানেই অনুব্রতর জবাব, ‘‘মুকুল রায়ের ব্যাপারে আমি কোনও কথা বলব না৷ এটা বলতে পারি আমার এখানে কোনও সমস্যা নেই৷ বিজেপির যদি সত্যিই বাড়বাড়ন্ত থাকত তাহলে দুবরাজপুরের মিছিলে ৪০ হাজার লোক হত না৷ বিজেপিতে যারা যাচ্ছে তারা সব সিপিএমের হার্মাদ৷’’ তবে প্রস্তাব পেলে তিনি কী বিজেপিতে যোগদান করতে পারেন? এসেছে এমন কোনও প্রস্তাব? সে ব্যাপারে অনুব্রতর বক্তব্য, ‘‘ওরা আমাকে সত্যিই কোনও প্রস্তাব দেয়নি৷’’

তবে অনুব্রতকে তাঁর চেনা মেজাজে খানিকটা দেখা গিয়েছিল গত শুক্রবার প্রকাশ্য সভায়৷ সাঁইথিয়ার ডাকবাংলো মোড়ে বিজেপির বিরুদ্ধে ধিক্কার সমাবেশে অনুব্ত বলেছিলেন, ‘‘যদি কেউ ভাবেন ঝামেলা করব, মস্তানি করব, আমরাও রাজি আছি। চোখ রাঙাবেন না, ধার ধারি না। দল করুন ভদ্র ভাবে।’’ সেখানে না থেমে তাঁর হুঁশিয়ারি ছিল, ‘‘মদ খেয়ে কারও বাড়িতে বাড়িতে পাঠাবেন না। তা হলে আমি গাঁজা খাইয়ে (লোক) পাঠিয়ে দেব। আপনারা যা করবেন, আমরা তার চারগুণ করব। যদি ভাবেন তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে ঘরে বসে আছি, তা হলে মূর্খের মতো ভাবছেন। আপনি ছড়ি দেখালে, আমরা ডান্ডা দেখাব। আপনি বাড়ি মারলে, আমরা পা ভেঙে দেব!’’

কিন্তু হুঙ্কার-এ যে ধারাবাহিকতা সেই সেকথা বলছেন জেলার বিরোধীরাই৷ ওই জেলারই কংগ্রেস বিধায়ক মিল্টন রশিদ বলেন, ‘‘অনুব্রত ভেবেছিলেন পাঁচনের বাড়ি, চড়াম চড়াম-এই ডায়লগগুলো ভোটের বাজারে হিট হবে৷ কিন্তু মানুষ এগুলো খায়নি৷ডায়লগগুলো কিন্তু পুরো ফ্লপ হয়ে গিয়েছে৷ তাই দিদি হয়তো ওঁকে এখন চুপ থাকতে বলেছেন৷ আসলে শাসক দলে থেকে টিভির মাইলেজ পেয়ে যা খুশি বললাম-এটা মানুষ ভালভাবে নেয় না৷ ‘আজ আছি, কাল নেই’-কথাটা সকলকেই মনে রাখতে হবে৷বিজেপি আপাতত ‘অপারেশন অনুব্রত’-তে জোর দিচ্ছে৷কারণ সেটা সফল হলেই দক্ষিণবঙ্গের একটা বড় অংশ তাদের হাতে চলে আসবে বলে মনে করছে বিজেপি৷’’