জয়ন্ত ঘোষাল: পশ্চিমবঙ্গে ভোট এসে গেছে, সে তো অনেকদিন ধরেই আমরা আলোচনা করছি। কিন্তু নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হয়ে যাওয়া মানে ভোটের দামামা বেজে যাওয়া। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবার আগে দার্জিলিং-এর তিনটি আসন বাদ দিয়ে সবগুলো আসনের প্রার্থী আজ ঘোষণা করে দিলেন। আর ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে শোরগোল পড়ে গেল। কংগ্রেস, সিপিএম আর সিদ্দিকিদের শিবিরেও তোলপাড়। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকেও একটা যৌথ তালিকা ঘোষণা হল। এবার বিজেপিও বৈঠকের পর বৈঠক করে চলেছে। শোনা যাচ্ছে, সোম-মঙ্গলবার তারাও প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দেবে। সুতরাং ভোটের দামামা বেজে গেছে।

যে কোনও নির্বাচনেই প্রধান আলোচ্য বিষয় কী হবে, সেটা যেমন একটা বড় ব্যাপার। আবার নির্বাচনে কোন দল, কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবে, সেটাও তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। যে কোনও নির্বাচনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু প্রার্থী। অর্থাৎ; কোন কেন্দ্রে কে প্রার্থী, সেখানে তার জনপ্রিয়তা কতটা। যদি তিনি সিটিং এমএলএ হন তাহলে তার বিরুদ্ধে জনমত রয়েছে কি না। তিনি কোন সম্প্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব করেন। কোন এলাকায়, কোন ধর্ম, কোন জাতি, নানান রকম ব্যাপার। -এটা একটা খুব কঠিন কাজ।

২৯৪ টি আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নানা ধরণের গবেষণা করতে হয়েছে। আর এটাই বোধহয় প্রথম নির্বাচন, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এইভাবে এত মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট অর্থাৎ; মাইক্রো স্টাডি করেছেন। ২৯৪ টি আসনের মধ্যে, কার্শিয়াং, কালিম্পং এবং দার্জিলিং –এই তিনটি আসনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী দেয়নি এবং পাহাড়ে যে প্রার্থী হবে, তার সঙ্গে বোঝাপড়া করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের স্বার্থে।

৮০ বছরের ঊর্ধ্বে কাউকে প্রার্থী না করা, -এটাও কিন্তু একটা প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়েছেন। ৮০ বছর বয়স হয়ে গেছে বলে যারা প্রার্থী হতে পারছেন না, তাদের মধ্যে যদি গুণগত উৎকর্ষ থাকে এবং প্রয়োজনীয়তা থাকে তাহলে ভবিষ্যতে বিধান পরিষদ গঠন করার কথা ঘোষণা করে তাদেরকেও ভবিষ্যতে পুনর্বাসনের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। -এটাও একটা সাংঘাতিক রাজনৈতিক রণকৌশল, যাতে এই নেতারা বিক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপিতে চলে না যান এবং যাতে নেতিবাচক ভূমিকা পালন না করেন। কেননা, তাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। আগামী দিনে তাদের’কে প্রয়োজন হবে। -এটা যদি তাদের মনের মধ্যে থাকে তাহলে তারা কিন্তু দুম করে দল ছাড়বে না।

এবারের ভোটে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র শারীরিক কারণে প্রার্থী হচ্ছেন না। আগামী দিনে তাকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসা হতে পারে এবং বিধান পরিষদেও তিনি আসতে পারেন। -এমন ইঙ্গিত কিন্তু পাওয়া গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

এবারের সবচেয়ে বড় ফোকাস হল, উনি নিজেই বলেছেন, বাংলার শাসনটাই হচ্ছে বড় জিনিস, অর্থাৎ; আমরা যারা আছি, তাদের কাছে বাংলা সংস্কৃতি এবং আমাদের এটা ভিটেমাটি রক্ষা করার ভোট। বাঙালি সংস্কৃতির ঠিকানা রক্ষা করা, বাংলার অস্তিত্বের ঠিকানা রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।

মমতা বন্দোপাধ্যায়

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে তপশিলী জাতি-উপজাতি এবং তাদের যে প্রতিনিধিত্ব, সেখানে যে কোটা আছে, সেই কোটার থেকে অন্তত ১১ জনকে বেশি প্রার্থী করেছেন। আর যারা টিকিট পাচ্ছেন না, অন্তত ২৫ জন সিটিং এমএলএ-কে টিকিট দেননি। ওই অ্যান্টি ইমকমপ্যান্সি অর্থাৎ; কারা ভোট জিততে পারবে না, সেটার সার্ভে করেছে। প্রশান্ত কিশোরের যে টিম, তারাও তাতে সাহায্য করেছে।

তারা যাতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপিতে চলে না যায়, বিজেপি তাদেরকে নিয়ে যাতে কোনও নেতিবাচক ভূমিকা পালন করতে না পারে, সেটাও কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সাবধানে দেখেছেন। সেই কারণেই বিধান পরিষদের আইডিয়াটা দিয়েছেন যে, একটা বিধান পরিষদ গঠন হবে, যেটা একসময় পশ্চিমবঙ্গে ছিল, এখন আর নেই। মমতা যখন প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তখনও কিন্তু বিধানসভার পাশাপাশি একটি বিধান পরিষদ গঠন করবেন বলেছিলেন। নানান কারণে তা সম্ভব হয়নি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারে সেটারও চেষ্টা করছেন।

তপসিলী জাতি, তপসিলী উপজাতির যে কোটা, তার থেকেও বেশি আসন দিয়ে তপশিলীদের সম্প্রদায়কে অ্যাড্রেস যেমন করা হয়েছে, সেরকম মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মতো একজন দলিত সাহিত্যিক’কে টিকিট দিয়ে নিয়ে এসে, একটা দলিত সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর একটা ছবি তুলে ধরা। -সেটাও একটা মস্ত বড় জিনিস হয়েছে এবারের নির্বাচনে। বিদেশ বসু, তিনি ফুটবলার ছিলেন, তাঁকে উলুবেড়িয়ার প্রার্থী করা হয়েছে। মনোজ তিওয়ারী, তাঁকে হাওড়ায় প্রার্থী করা হয়েছে। ক্রিকেটার লক্ষ্মী রতন শুক্ল, তিনি চলে গেছেন। তার বদলে একাধিক খেলোয়াড় তিনি নিয়ে এসেছেন।

আবার বিজেপিও যেরকম স্টারদেরকে এবং টেলি সিরিয়ালের লোকেদেরকে করায়ত্ত করার চেষ্টা করেছে। কেননা, সিপিএমের সময়ে এই ফ্লিমস্টারদেরকে নিয়ে মাতামাতিটা খুব একটা ছিল না। যেমন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা তরু মজুমদার, তারা সিপিএম-কে সমর্থন করেছেন কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় খুব একটা অংশ নেননি। তার ফলে সেই সময় খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে তারা কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেননি।

সিনেমা জগতের একটা বিপুল জনসমাজকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে এসেছিলেন। তাদের অনেককে এমপি করেছেন, এমএলএ করেছেন। বিজেপি সেটা ভাঙার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। বিজেপির নেতারা, আরএসএস-এর নেতারা কখনো প্রসেনজিতের সঙ্গে দেখা করছে, কখনো মিঠুনের সঙ্গে দেখা করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এবারে অন্তত ১০ জন চিত্রতারকা বা টলিউড তারকা প্রার্থী করেছে।

যেমন, জুন মালিয়া থেকে শুরু করে সায়নী, রাজ চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, সোহম, কৌশানী, লাভলী মৈত্র নানান চরিত্র। এখন এই চরিত্রগুলোকে টিকিট দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, এরা তো শুধু অভিনেতা নয়, এদের মধ্যে নবীন প্রজন্ম আছে এবং এরা একটা সিভিল সোসাইটি, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজকেও প্রতিনিধিত্ব করছে। এবারে সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু একটা শৈলী দেখিয়েছেন, তার এই প্রার্থী তালিকা নির্মাণে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.