তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: গত শনিবার কারোর নাম না করে ফেসবুকে পোষ্ট করেছিলেন উপ পুরপ্রধান তৃণমূল নেতা দিলীপ আগরওয়াল। এবার তিনি সরাসরি বাঁকুড়া পুরসভার পুরপ্রধান মহাপ্রসাদ সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে মুখ খুললেন৷

পরিষ্কার দ্ব্যার্থহীন ভাষায় এদিন তিনি বলেন, ”দীর্ঘ দিন ধরেই আমার পুরপ্রধানের সঙ্গে মতানৈক্য চলছে। প্রায় এক বছর ধরে পুরসভার নানান উন্নয়নমূলক কাজ তাকে সম্পূর্ণভাবে অন্ধকারে রেখে করা হচ্ছে এমনটাই অভিযোগ তোলেন তিনি৷ নিয়মানুযায়ী পুরবোর্ডের সভা ডাকার আগে উপ পুরপ্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে তারিখ ও আলোচ্য সূচী ঠিক করার কথা। কিন্তু পুরপ্রধান তা করছেন না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তাঁর দাবি এই ঘটনার একাধিকবার প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি দলকে জানালেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি৷ ১৯৮২ সাল থেকে রাজনীতি করে আসছি দাবি করে উপপৌরপ্রধান দিলীপ আগরওয়াল৷ বলেন, দিল্লিতে একটি পুরসভা বিষয়ক আলোচনা সভায় পুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। ওখান থেকে কলকাতায় ফিরে তিনি ওই ফেসবুক পোষ্ট করেন বলে জানান। দীর্ঘদিন তার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে৷

তিনি আরও বলেন, বাঁকুড়ায় কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে, কিন্তু আমাকে কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাই আমি ফেসবুকে পোষ্ট করেছিলাম রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় কাজ করতে পারছি না। অতি সম্প্রতি তার দিল্লী যাওয়া নিয়ে ও বিজেপিতে যোগদান নিয়ে মন্তব্য করছেন ‘তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন’ বলে মন্তব্য করে তিনি৷ তৃণমূলে ছিলেন, আছেন ও থাকবেন দাবি করে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন উপপুরপ্রধান দিলীপ আগরওয়াল।

তাঁর দাবি, কোন ধরণের টেণ্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ থাকা স্বত্বেও পুরপ্রধান স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে কয়েক জন ‘পেটোয়া’ ঠিকাদারকে দিয়ে টেণ্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ করাচ্ছেন বলে তার অভিযোগ। একই সঙ্গে পুরসভার একটি প্রকল্পে ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকার পাইপ চুরি হয়েছে। সেই চুরির কিনারা আজও হয়নি বলে তার অভিযোগ। বিষয়টি জেলাশাসক থেকে দলীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন বলে জানান। একই সঙ্গে মহাপ্রসাদ সেনগুপ্তের পুরপ্রধান হওয়ার আগে ও পরে কি সম্পত্তি হয়েছে তা তদন্ত করে দেখার অনুরোধ জানান।

পুরপ্রধান মহাপ্রসাদ সেনগুপ্ত উপপুরপ্রধানের ফেসবুক পোষ্ট নিয়ে কটাক্ষ করে বলেন, দশ ফুট দূরত্বে আমাদের দু’জনের চেম্বার হওয়া স্বত্বেও এমন কি হল যে জেলা ও রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে ওনাকে দিল্লীতে বসে ফেসবুকে পোষ্ট দিতে হল। এর মধ্যে এমন কি রহস্য আছে তা তার জানার দরকার আছে। প্রতিটি কাজের টেণ্ডার হয়েছে দাবি করেন তিনি৷ বলেন, উনি প্রমাণ করুন কোন কাজটা টেণ্ডার ছাড়া হয়েছে। ওনাকে বেশ কিছু কাজের দায়িত্ব দেওয়া আছে দাবি করেন পুরপ্রধান৷

তিনি বলেন, আমি যতোটুকু কাজ করি স্বচ্ছতার সঙ্গে করি। উনি তো নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে আসেন আর চলে যান৷ আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত অফিসে কাজ করতে হয়। ‘পাইপ চুরি’ প্রসঙ্গে পুরপ্রধান বলেন, সংশ্লিষ্ট এজেন্সি পাইপ চুরির কথা আমাদের জানিয়েছিল। কিন্তু চুরি যাওয়ার কথা বললেও ওই এজেন্সিকে রেহাই দেওয়া হয়নি। পুরসভা থেকে তাদের পাইপ দেওয়া হয়েছিল। কাজ বুঝে নেওয়া হবে। তারা কাজ না করায় শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল৷ সেই নোটিশের সময়সীমা পেরোনোর পর তাদের নামে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

টেণ্ডার না করে ‘পেটোয়া’ ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া ও সম্পত্তির হিসাব নিয়ে উপপুরপ্রধানের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নিজে ব্যবসা করি। আমরা স্ত্রীও কাজ করে। আমি ইনকাম ট্যাক্স দিই। ওনার এই অভিযোগের তদন্ত হোক। দলীয় ও সরকারি সব তদন্তের মুখোমুখি হতে রাজি বলেও জানান পুরপ্রধান মহাপ্রসাদ সেনগুপ্ত৷

পুরপ্রধান-উপপুরপ্রধানের এই কাদা ছোঁড়াছুড়ি নিয়ে বিজেপির পক্ষ থেকেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বিজেপি নেতা ও কাউন্সিলর নীলাদ্রী দানা বলেন, আমি গত মিটিং এ বলেছি, আপনি পুরপিতা। পুরসভা কোন কাজ নিয়ে কালিমালিপ্ত হওয়া মানে আমরা সবাই কালিমালিপ্ত হব। পুরপিতা-উপপুরপিতার এই দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয় বলেন দাবি করেন তিনি৷ বলেন, এই ঘটনা সম্পূর্ণ ওদের দলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের ফল।

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব না হলে এই ঘটনা এতো সহজে প্রকাশ হত না বলেও তিনি মনে করেন। শহরবাসীর মধ্যেও এই ঘটনা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ পুরপ্রধানের পক্ষে মত দিলেও অনেকেই উপপুরপ্রধানের বক্তব্যের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। তবে তারা কেউই সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে চাননি। এই বিষয়ে বাঁকুড়া জেলা তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি জয় চট্টোপাধ্যায় জেলায় এই মুহূর্তে কোন ‘গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব’ নেই দাবি করে বলেন, বিষয়টি আমাদের কানেও এসে পৌঁছেছে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে পুরো ঘটনা ঘটনা জানানো হয়েছে। তারাই এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তিনি জানান।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV