সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনিও স্বাধীনতা সংগ্রামী। এই জানুয়ারিতেই তাঁর জন্ম দিন। এই বাংলারই স্বাধীনতা সংগ্রামী তিনি। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আজকাল আর আলোচনা হয় না। কোথাও জন হারিয়ে গিয়েছে বাঁশের কেল্লা গড়ে তিতুমিরের ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ইতিহাস। সেই তিতুমীর যার প্রকৃত নাম ছিল মীর নিশার আলি, তিনি মক্কা থেকে ফিরে নেমে পড়েছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবে।

তিতুমীরের জন্ম হয় ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগণায় জেলার বসিরহাট মহকুমা, বাদুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত হায়দারপুর গ্রামে। তিনি সম্পূর্ণ ভাবে এক কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৮২১ খ্রী: তিতুমীর মক্কায় হজ করতে যান, সেখানে গিয়ে স্বাধীনতা অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়। পরে সৈয়দ আহমেদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি, ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। এরপর তিনি মক্কায় থেকে ফিরে এসে তিতুমীর তাঁর গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনে যোগদান করেছিল হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়।

 

 

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা বিহার উড়িষ্যা কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আদিপত্য প্রতিষ্ঠার স্থাপনের ফলে মধ্যবিত্ত, কৃষক, তাঁতি কারিগর ও শিল্পী প্রভৃতি সাধারণ মানুষজন সমস্যায় সম্মুখীন হয়। কারণ ইংরেজ দের এই আধিপত্য স্থাপনের মৃল লক্ষ্য ছিল সামাজ্যেবাদী ব্যাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল। এরফলে কোম্পানির সরকার প্রবর্তিত নতুন রাজস্ব নীতি ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, চিরাচরিত বিচারব্যবস্থা স্থলে নতুন বিচারব্যবস্থা ও আইনকানুন প্রবর্তন এবং ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ভারতবাসীর মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের জেরে ব্রিটেনেরর কলকারখানায় ব্যপক হারে ভোগ্যপণ্য উৎপাদিত হতে থাকে। এরফলে ভারতীয় পণ্য উপর উচ্চ হারে কর ভার চাপিয়ে সরকার বিভিন্ন ছলে কৌশলে ভারতীয় শিল্পের ধংসের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে বিভিন্ন কুটীরশিল্প ধংস হয়ে যায়।

এইসময়ে বেকার কৃষক, তাঁতি, কারিগর, শিল্পী প্রভৃতি সাধারণ মানুষ এক বিদ্রোহে সামিল হয়। এর থেকে বিভিন্ন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনেরর সূত্রপাত ঘটে। এই সব বিদ্রোহের মধ্যে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধাননেতা তিতুমীরের নেতৃত্বে “বারাসাত বিদ্রোহ” তিতুমীরের আন্দোলনের জেরে জমিদার ও নীলকর সাহেবরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

জমিদার, নীলকরসাহেব ও ব্রিটিশ সরকার তিতুমীরের আন্দোলনের বিরুদ্ধে সমবেত হয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল , ‘যারা তিতুমীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করবে, এবং ওয়াহাবি হবে ও দাড়ি রাখবে তাদের জরিমানা দিতে হবে। তিতুমীরকে বাড়িতে স্থান দিলে বাড়ি ঘর থেকে উচ্ছেদ করা হবে।’

দমে থাকেননি তিতুমীর। সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত ছিল তিতুমীরের সেনা। ১৮৩১ সালে ২৩ অক্টোবর উত্তর চব্বিশ পরগণায় জেলায় বারাসাতের কাছে বাদুরিয়ার থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে নারিকেলবেড়িয়া গ্রামে তিনি বাঁশের কেল্লা তৈরী করেন।

বাঁশ ও মাটি দিয়ে তৈরী বাঁশের কেল্লা তৈরী করেন। এই কেল্লা ছিল তিতুমীর ও তাঁর সহ আন্দোলনকারীদের সদর দফতর। তিতুমীর চব্বিশ পরগণা, নদীয়া, এবং ফরিদপুর (বাংলাদেশ) বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন জমিদার ও ব্রিটিশ শাসণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের কাছে বেশ কয়েকবার পরাজয় হয়। শোনা যায় তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষক সেনা যোগদান করেছিল।

১৮৩১ সালে এই বিদ্রোহের দমনের উদ্দশ্যে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরের বিরুদ্ধে এক অভিযান শুরু করেন। প্রথমে ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারিদিকে ঘিরে ফেলেছিল। ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন লেখাঁ থেকে জানা যায়, তিতুমীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন,’ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে, লড়াইয়ে হার জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে হবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যাদা অনেক, তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়, আমাদের কাছে থেকে প্রেরণা পেয়েই এদেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে, আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এইপথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।’

তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র, বল্লম, বর্শা, ও লাঠি এইসব নিয়ে তিতুমীর ও তাঁর অনুগামীরা সৈন্যদলেরা ব্রিটিশদের আধুনীক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। এর কারণ ব্রিটিশ দের উন্নতমানের অস্ত্র থাকার ফলে হার নিশ্চিত ছিল তিতুমীর দের। শেষে কামানের আঘতের বাঁশের কেল্লা ধংস হয়। এরফলে তিতুমীর ও তাঁর অনেক অনুগামীরা বীরের মত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন। তিতুমীরের বাহিনী প্রধান মাসুম খাঁ’কে ফাঁসি দেওয়া হয়। এছাড়া অনেককেই দীর্ঘমেয়াদে কারাদন্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। বহুসংখ্যক অনুসারিসহ তিতুমীর যুদ্ধে শহীদ হন ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর।