তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: ‘বাঘের ভয়ে’ বন্ধ হয়ে গেল আইসিডিএস কেন্দ্র৷ গ্রামের প্রাথমিক স্কুলেও ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকের উপস্থিতির সংখ্যা হাতে গোনা। ঘটনাটি বাঁকুড়ার সিমলাপালের নেকড়াতাপল গ্রামে।

গত কয়েকদিন ধরে ‘বাঘের আতঙ্কে’ দিন কাটছে বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের সিমলাপাল-সারেঙ্গা ব্লক এলাকার বাসিন্দারা৷ সর্বশেষ গতকালই সিমলাপালের জঙ্গল লাগোয়া পিঠাবাকড়া গ্রামের মাঠে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল ‘বাঘের পায়ের ছাপ’। বাড়ির পাশেই এই ঘটনায় যথেষ্ট আতঙ্কিত জঙ্গলমহলবাসী। আর এই ‘আতঙ্কে’র মধ্যেই শুরু হয়েছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষাকেন্দ্রে ঠিক-ঠাক পৌঁছতে এখন চরম আতঙ্কে পরীক্ষার্থী থেকে অভিভাবক সকলেই।

রবিবার যেখানে তথাকথিত ‘বাঘের পায়ের ছাপ’ দেখতে পাওয়া সিমলাপালের পিঠাবাকড়া থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে নেকড়াতাপল গ্রামে সোমবার সকালে পৌঁছে দেখা গেল গ্রামের একমাত্র আইসিডিএস কেন্দ্রটি ‘বাঘের ভয়ে বন্ধ’। ওই আইসিডিএস কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী বা প্রাথমিক স্কুলের অনুপস্থিত শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা যায়নি। তাই এবিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমনকী প্রাথমিক স্কুলের প্রায় আশি জন ছাত্র ছাত্রীর মধ্যে উপস্থিতি মাত্র ছ’জন। বেলা বারোটা পর্যন্ত চার জন শিক্ষকের একজন উপস্থিত হয়েছেন৷ কী কারণে এতজন ছাত্র অনুপস্থিত, শিক্ষকরা কেন আসেননি। এর মধ্যে কি বাঘের আতঙ্ক কাজ করছে? মুখ খুলতে রাজি হননি এদিন ওই স্কুলে একমাত্র উপস্থিত শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র সরেন।

তবে ছাত্র ছাত্রী প্রত্যেকেই স্বীকার করেছে বাঘের ভয়েই অনেকে স্কুলে আসেনি। অভিভাবকরাই পাঠাতে চাননি তাদের শিশু সন্তানদের। ওই স্কুলের ছাত্র সুগত হাঁসদা, সোমনাথ সরেন বলে, ‘‘বাঘের ভয় তো একটাই আছে। তবুও স্কুলে এসেছি। বাবা মায়েরাই পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে৷’’

সিমলাপালের দুবরাজপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পিঠাবাকড়া, নেকড়াতাপল, জামবনি, বালিঝুরঝুরি, পুটিয়াদহ, চাঁদপুর জঙ্গলঘেরা গ্রামগুলির ছাত্র ছাত্রীদের অবস্থা আরও দুর্বিষহ। প্রত্যেককেই প্রায় দু’কিলোমিটার জঙ্গল পথ পেরিয়ে প্রাইভেট, টিউশন বা স্কুল-কলেজে যেতে হয়। বাঘের আতঙ্ক দেখা দেওয়ায় চরম সমস্যা তাদের।

এদিন সকালে দল বেঁধে সকলে একসঙ্গে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে প্রাইভেট টিউশন যাচ্ছিল কলেজ পড়ুয়া অর্চনা দত্ত, রেশমি নন্দী৷ তাঁরা বলেন, ‘‘বাঘের ভয়ে একা একা যেতে তো ভয় করছেই। কিন্তু সামনে পরীক্ষা। স্কুল কলেজ, প্রাইভেট টিউশন তো এই মুহূর্তে কামাই করা চলবে না৷’’ তাই অভিভাবকরাই এখন ভরসা।

একই কথা শোনালেন স্থানীয় জামবনি গ্রামের অভিভাবক বলরাম দত্তও৷ তিনি বলেন, ‘‘গতকাল যেখানে বাড়ির পাশেই জঙ্গলে বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া গিয়েছে। সেখানে আতঙ্ক-মুক্ত থাকি কী করে। স্কুল, কলেজ বাড়ির ছেলেমেয়ের পাঠাতে ভয়ের কথা জানিয়ে তিনি এলাকার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি জানিয়েছেন৷

সত্যিই কি বাঘ? নাকি রয়েছে এর পিছনে কোনও রহস্য? সেই বিষয়টা যখন পরিষ্কার হচ্ছে না তখনও৷ বাঘের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে জঙ্গলমহলের মানুষকে। সিমলাপালের বিডিও রবীন্দ্রনাথ অধিকারীকে এবিষয়ে টেলিফোনে জিজ্ঞাসা করা হলে কলকাতা 24×7 কে তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার কথা আমিও শুনেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় জোরদার প্রচার চালানো হচ্ছে।’’

জঙ্গল এলাকার মানুষকে অযথা গুজবে কান না দিতে অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘‘ওই পায়ের ছাপ সত্যিই বাঘের কিনা তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। তল্লাশিতেও বাঘের সন্ধান মেলেনি।’’ তবুও প্রশাসনিকভাবে ঐ এলাকায় প্রচার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।