সুমন ভট্টাচার্য: সচিন তেন্ডুলকর, অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী-সহ সেলিব্রিটিদের খোঁজ করছিলাম। করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউতে ‘সরকারি’ এইসব সেলিব্রিটিরা কোথায়? দিল্লি এবং মুম্বইতে যখন করোনা জেরে ত্রাহি ত্রাহি রব, তখন মিঠুন চক্রবর্তী বা সচিন তেন্ডুলকররা কোন সাহায্যের হাতটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন?

লিখলেন– সুমন ভট্টাচার্য

কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং চিকিৎসক সংগঠনের নেতা অর্জুন দাশগুপ্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় মজা করে লিখেছেন—যদি পপতারকা রিহানা বা পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ ভারতবর্ষে করোনা রোগীদের অসহায় অবস্থা নিয়ে কোনও টুইট করতেন, তাহলে হয়তো ‘শাসক-ভক্ত’ এই সব সেলিব্রিটিদের ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যেত, সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যেত ‘স্ট্যান্ড উইথ ইন্ডিয়া’ এই ধরনের হ্যাশট্যাগে।

করোনার প্রথম ধাক্কার সময় একমাত্র অভিনেতা সোনু সুদকে দেখা গিয়েছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে, তাঁদের ঘরে ফেরার ব্যবস্থা করতে। আর এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় ভূমি পেডনেকর এগিয়ে এসে দিল্লিবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন, যাঁরা ইতিমধ্যেই করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাঁরা যেন প্লাজমা দান করেন, তাহলে দিল্লিবাসীর সুবিধে হবে। এই দু’জন ছাড়া এখনও পর্যন্ত কোনও সেলিব্রিটি করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউ যখন গোটা দেশকে বেসামাল করে দিচ্ছে, হাসপাতালগুলিতে তীব্রতর অক্সিজেন সঙ্কট, তখন এগিয়ে এসে কিছু বলেছেন।

মিঠুন চক্রবর্তীর আগে কলকাতায় বিজেপির ব্রিগেড সমাবেশে যাঁর আশার সম্ভাবনা নিয়ে জোর জল্পনা হয়েছিল, সেই অক্ষয় কুমার অবশ্য যাবতীয় দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে পারেন, কারণ শুক্রবার থেকেই কানাডা বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতোই ভারতের সঙ্গে বিমান সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এতদিনে আমরা সবাই জেনে গিয়েছি, খোদ প্রধানমন্ত্রী বলিউডের যে অভিনেতাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন রণতরীর উদ্বোধন করেন, বা নির্বাচনের দিন নরেন্দ্র মোদী যে অক্ষয় কুমারকে একমাত্র সাক্ষাৎকার দেন, তিনি আসলে কানাডার নাগরিক। তাই অক্ষয় কুমার হয়তো দায় ঝেড়ে ফেলতিই পারেন, কেন তিনি এই সঙ্কটের সময় এগিয়ে আসেননি, এই প্রশ্ন উঠলে। কিন্তু বাকিরা? যে-সব সেলিব্রিটিরা যে-কোনও সময় সরকারের পাশে দাঁড়াতে সদা তৎপর, বিভিন্ন সময় নিজেদেরকে সরকার-ভক্ত বলে প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর থাকেন, তাঁরা এখন কোথায়?

সচিন তেন্ডুলকর থেকে শুরু করে অনেক ক্রিকেটার, বলিউডের অনেক সেলিব্রিটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যখন রিহানা বা গ্রেটা থুনবার্গের মতো আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটিরা দিল্লির উপকণ্ঠে চলতে থাকা কৃষক বিক্ষোভের দিকে গোটা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষেণের চেষ্টা করেছিলেন। তখন তাঁদের মনে হয়েছিল, এটা আসলে ভারতবর্ষকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ‘অপমান’ করার চেষ্টা। সেই সময় সরকারের, নরেন্দ্র মোদীর সরকারের ‘পাবলিক রিলেশন ড্রাইভ’-এর অঙ্গ হিসেবে তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়া ভরিয়ে দিয়েছিলেন নিজেদের টুইটে। আর এখন খাস রাজধানী দিল্লিতে যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে বেলাগাম অবস্থা, তখন তাঁদের কাছ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। তাহলে কি ধরেই নিতে হবে যে বিষয়গুলির সঙ্গে সাধারণ মানুষের আবেগ বা স্বার্থ জড়িত, সেগুলিতে আমাদের সেলিব্রিটিরা প্রতিক্রিয়া দেন না?

মার্কিন মুলুকে করোনার যে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে এবং তার উৎপাদন হয়েছে, সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পেছনে অনেক সেলিব্রিটি টাকা দিয়েছেন। যেমন ডলি প্যাট্রন। আমাদের দেশের কোন তারকাকে শোনা গিয়েছে ভ্যাকসিনের গবেষণার জন্য নিজেদের উপার্জন থেকে টাকা দিতে? আর এখন দ্বিতীয় ঢেউতে ভারতবর্ষের অন্তত ১০টি রাজ্যে যখন অক্সিজেনের হাহাকার, তখন কি শুনেছেন কোনও সেলিব্রিটি চার্টার্ড প্লেন ভাড়া করে অক্সিজেন পৌঁছে দিচ্ছেন?

অথচ এই সেলিব্রিটিরাই, যেমন মিঠুন চক্রবর্তীর চার্টার্ড ফ্লাইটে এসে নির্বাচনী প্রচার করে যান। এবং আমাদের তাঁর, ‘গোখরোর’ সংলাপ শুনতে হয়, ‘এক ছোবলেই ছবি’। সেই মিঠুন চক্রবর্তী পশ্চিমবঙ্গের করোনার রোগীদের জন্য কী করেছেন? ভ্যাকসিন কিংবা রেমেসিডিভির জন্য যখন লোকে হা-হুতাশ করছে, তখন মিঠুন চক্রবর্তীর মতো তারকারা কোথায়?

করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল অবস্থাটাকে আর একবার দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমরা অনেকের স্বরূপ চিনতে পারছি। বোধহয় এবার এইসব সেলিব্রিটিদেরও চিনে নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.