তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: দিনের শুরু হয় জাতীয় সঙ্গীতের সুরে৷ এলাকার প্রান্তিক পরিবারের কচিকাঁচাদের সহজ গলায় ফুটে ওঠে জীবনের জয়গান৷ স্কুলের খড়ের ফুটো চাল বেয়ে দিনের প্রথম সূর্যের আলো ঢোকে ঘরে, আবার সেই ফুটো দিয়ে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাটাও ঢোকে। তারই মধ্যে তিরিশ-পঁয়ত্রিশটি শিশু কন্ঠে বেজে ওঠে পড়াশুনার প্রথম পাঠ।

এই সবকিছুর পিছনে যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, তিনি জ্যোৎস্না সেনগুপ্ত। বাঁকুড়ার পাত্রসায়র ব্লকের হামিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পারুলিয়া গ্রামে প্রায় তিরিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে অবৈতনিক পাঠশালা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ নিয়ে এই বছর গুলিতে এলাকার পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত।

একদিন সব ছিল জ্যোৎস্না সেনগুপ্তের। কিন্তু পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি একা হলেও রয়েছে তার অসংখ্য গুনমুগ্ধ ছাত্র ছাত্রী। কিন্তু কিন্তু এতো সবের পরেও ভালো নেই বৃদ্ধা জ্যোৎস্না সেনগুপ্ত। কারণ প্রাণাধিক প্রিয় ছাত্র ছাত্রীরা প্রত্যেকেই তার বাড়িতে এসেই পড়াশুনা করে। কিন্তু সেই বাড়িটাই এখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে চলেছে। চার দিকে ঝোপঝাড়, দিকে দিকে দেওয়াল ভেঙ্গে পড়ছে, খড়ের চাল বেয়ে পড়ছে জল।

এসবের মাঝেও রোজ নিয়ম করে এলাকার আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলে মেয়েরা তার কাছে ছুটে আসে। তিনিও যেন অপেক্ষায় থাকেন কখন আসবে তারা। কিন্তু এতো সবের পরেও ঐ ভাঙ্গা বাড়িটার নিচেই এক বুক আশঙ্কা আর দোলাচলের মধ্যে তাদের নিয়ে পড়াতে বসেন তিনি।

তাদের শিক্ষিকার জন্য একটা বাড়ির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছে ছাত্র ছাত্রীরাও। জ্যোৎস্না সেনগুপ্তের কাছে পড়তে আসা বাদল বাগদী বলে, বৃষ্টি হলেই আমরা ভিজে যাই। ঘরের ভিতরে জল পড়ে। দিদিমনির একটা বাড়ি হলে ভালো হয়। পড়তে পড়তে বৃষ্টি আসার ফলে অনেক সময় ভিজে যাওয়ার সমস্যা তো আছেই, পাশাপাশি চার দিকে যেভাবে ঝোপঝাড় তৈরী হয়েছে তাতে প্রায়শই সাপ বেরোনোর ঘটনা ঘটছে বলে ছাত্র ছাত্রীদের অনেকে জানিয়েছে।

ছাত্র ছাত্রীদের মতো পাড়া প্রতিবেশী আর গ্রামবাসীরাও চাইছেন জ্যোৎস্না সেনগুপ্তের জন্য প্রশাসন একটি বাড়ির ব্যবস্থা করুক। গ্রামবাসী শান্তি গোপাল ভট্টাচার্য বলেন, আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলে মেয়েদের উনি সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় পড়াচ্ছেন। এই ছবিটা আমরা গত তিরিশ বছর ধরে দেখে আসছি। ওনার বাড়িটি বর্তমানে ভগ্নস্তুপে পরিনত হতে চলেছে। ফলে একটি বাড়ি তৈরী হলে এই বৃদ্ধার মাথা গোঁজার মতো একটু ঠাঁই যেমন হবে, তেমনি নিশ্চিন্ত আর নিরাপদে পড়াশুনার সুযোগ পাবে এলাকার কচি কাঁচারা। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলে তার অভিযোগ।

এবিষয়ে জ্যোৎস্না দেবী বলেন, শুধুমাত্র ভালো লাগা থেকেই তিরিশটা বছর ছাত্র ছাত্রীদের পড়াশুনা করিয়ে আসছি। তবে বাড়ির সমস্যা যে তাকেও ভাবায় সেবিষয়টা পরিস্কার করেছেন তিনিও। এবিষয়ে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য ভাস্কর চন্দ্র বাগদি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা উর্দ্ধতন কর্ত্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে সরকারি খাতায় কলমে উনি ‘এপিএল তালিকাভুক্ত হওয়ায় সমস্যা তৈরী হচ্ছে বলে তিনি জানান।