সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: লর্ড কার্জনের কলমের আঁচড়ে বঙ্গভঙ্গ হতে চলেছে। গর্জে উঠেছে বাংলার মানুষ। আঁচ এসে পড়েছিল সুপ্রাচীন বন্দর নগরী আমতার বুকে। মার্টিন রেল,পান্তুয়া,সতীপীঠ মেলাইচন্ডী মন্দির সমৃদ্ধ এই ঐতিহাসিক জনপদ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে। আরও বড় আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন যুব শক্তির। যেন শক্তি যোগাবেন বিদ্যার আরাধ্যা দেবী। অনেকটা এমন ভাবনা নিয়েই তাঁর আরাধনার মাধ্যমে ছাত্র-যুবদের একছাতার তলায় আনার পরিকল্পনা করল একদল যুবক। শুরু হল বঙ্গ ভঙ্গের প্রতিবাদকে সুসংগঠিত করতে বাগ দেবীর আরাধনা। ১১৫ বছর আজও সমান আড়ম্বরে পূজিতা হচ্ছেন দেবী সরস্বতী। সঙ্গে থাকেন ভারত মাতা।

১৯০৫ সালে মহাধুমধাম সহকারে অষ্টম পরী সহ ডাকের সাজে সুসজ্জিতা হয়ে মৃন্ময়ী মায়ের মন্ডপে আগমন ঘটে।১৯০৫ সালের সেই প্রথম পুজোয় পৌরহিত্য করেন বঙ্কিম চক্রবর্তী।মাতৃ আরাধনা ও ভোগ প্রস্তুতির জন্য গড়ে উঠল মাটির ঘর। তারই সঙ্গে সংহতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে কিশোরীমোহন ঘোষ,কাশীনাথ সাউ,দেবেন চক্রবর্তী,কালী কুন্ডু,গৌর চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ তৎকালীন উদ্যোমী যুবকদের নিরলস প্রচেষ্টায় আমতার দক্ষিণ পাড়ায় গড়ে উঠল ‘আমতা বাণী সংঘ’। দেবীর নামেই নবগঠিত সংগঠনের নামকরণ করা হয়। ১৯০৫ সালের পর থেকে প্রতিবছরই ধুমধামের সাথেই পলাশপ্রিয়ার আরাধনায় মেতে ওঠে আমতার এই প্রাচীন সরস্বতী আরাধনার প্রাঙ্গণ।

‘আমতা বাণী সংঘ’-এর বর্তমান সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিক্ষক সুমন্ত সাউ বলেন, ‘দক্ষিণপাড়ার মা যে স্থানে দেবী পূজিতা হতেন সেই স্থান সরস্বতীতলা হিসাবে জনমুখে পরিচিত লাভ করে। দেবীর আরাধনা উপলক্ষে এক সপ্তাহব্যাপী মেলা,যাত্রা,লেটোগান,তরজাগান,নাটক,নরণারায়ণ সেবাকে কেন্দ্র করে কার্যত আনন্দভূমিতে পরিণত হত আমতা বাণী সংঘ সংলগ্ন প্রাঙ্গণ।’ একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৬৬ সালে ভয়াবহ বন্যায় মাটির মাতৃমন্দির ভেঙে পড়ায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সেবছরই পাকা ঠাকুর দালান গড়ে উঠল। দেবীর সঙ্গে থাকেন ছয় পরী। ছয় পরী যথাক্রমে ভারতমাতা, বঙ্গমাতা,দুই বেলপরী,জয়া এবং বিজয়া। শতাব্দীপ্রাচীন দেবীকে বিসর্জন করা হত বাঁশের ডুলিতে করে। এই পুজোকে কেন্দ্র আমতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের সাড়া ছিল অভূতপূর্ব।

দেবীর বিভিন্ন মহিমার কথা আজও লোকমুখে প্রচারিত হয়। প্রথমে বেতাই গ্রামের কেদার মিস্ত্রী ও পরে থলিয়া গ্রামের জীবন মিস্ত্রী ও তারঁ উত্তরসূরিরা মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করতেন। মা’কে যেমন সাজেই সাজানো হোক না কেন তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ চিরাচরিত রূপেই প্রতিভাত হন বলে স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেন।’ ১১৫ বছর বহু পরিবর্তন হয়েছে দেশে। আড়ম্বর বেড়েছে গ্রামীণ সরস্বতী পূজাতেও। মাটির ঘরের পরিবর্তে মা আজ পূজিতা হন পাথর বসানো পাকা দালানে,আজ মা বাঁশের ডুলির পরিবর্তে ট্রলিতে চেপে পাড়ি দেন বিসর্জনের পথে।কিন্তু রয়ে গেছে শতবর্ষের ঐতিহ্য।আমতা বাণী সংঘের এই পুজো গ্রামীণ হাওড়ার বহু অজানা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষীরূপে আজও বর্তমান।আজও মায়ের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে তিনদিনব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুঃস্থ পড়ুয়াদের সম্বর্ধনা,বস্ত্রবিতরণ,রক্তদান শিবির,বিনাব্যয়ে চিকিৎসা শিবিরের ন্যায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। আবাহন থেকে বিসর্জন, দেবী আরাধনায় মেতে উঠবে আমতা শহর।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ