সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : আধুনিক ভারতের নন জাগরনের অন্যতম রূপকার তিনি। বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন ধর্ম বাদ দিয়ে বিজ্ঞানমস্কতার মাধ্যমে সবকিছুর বিচার করতে। তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত। ব্রাহ্ম সমাজের অঙ্গ হয়েও শিখিয়েছিলেন বেদ একেবারেই অভ্রান্ত নয় বরং এতে অনেক ভুল রয়েছে। সাহসিকতার সঙ্গে বলেছিলেন বেদ ঈশ্বরের সৃষ্টি নয় , বিশ্ববেদান্তই প্রকৃত বেদান্ত। বিজ্ঞানই আসল। তাই গড়তে পারে আগামীর পৃথিবী।

অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম ব্রাহ্ম ধর্মে দিক্ষিত ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। সেই তাঁরই আবার ধর্মের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত ছিল। তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজে বেদকে ঈশ্বরের সৃষ্টি বলে মনে করা হলেও অক্ষয়কুমার দত্ত তা মানতেন না। ১৮৫১ সালের ২৩ জানুয়ারি ব্রাহ্মহ্মসমাজে একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, বেদ ঈশ্বরপ্রত্যাদিষ্ট নয়, বিশ্ববেদান্তই প্রকৃত বেদান্ত, অর্থাৎ ‘অখিল সংসারই আমাদের ধর্মশাস্ত্র। বিশুদ্ধ জ্ঞানই আমাদের আচার্য’ (The whole world is our scripture and pure rationalism is our teacher)। এছাড়া সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলা ভাষায় উপাসনা হওয়া উচিত বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন, ১৮৫৩ সালে খিদিরপুরের ব্রাহ্মসমাজ তা গ্রহণও করেছিল। পরে অবশ্য অক্ষয়কুমার দত্ত ঈশ্বর উপাসনা বা প্রার্থনা বিষয়টিকেই অগ্রাহ্য করেন। তিনি বীজগণিতের সূত্রের মাধ্যমে দেখিয়ে দেন যে, মানুষের বাসনা পূরণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার কোনও প্রয়োজন নেই।

১৮৩৩ সালে রামমোহন রায় মারা যাওয়ার পর ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনটি বাধার সম্মুখীন হয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) এই কাজে হাত নেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনটি নতুন মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য পরিগ্রহ করে। তিনি ১৮৩৯ সালে তত্ত্ববোধিনী সভা নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন যা এই নতুন ধর্মমত প্রচারে ভীষণভাবে সচেষ্ট হয়। তিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা নামে একটি সংবাদপত্রও প্রকাশ করেন যেটি এ নতুন ধর্মবিশ্বাস প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সংস্কার সাধনের পক্ষেও জনমত গড়ে তোলে। এ সময়ে হিন্দুধর্মের বিপক্ষে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারকদের অত্যধিক আক্রমণাত্মক প্রচারণা চলছিল। ব্রা

হ্ম সমাজের মধ্য থেকে আমূল সংস্কারের সমর্থক শ্রেণীটি বেদ যে অভ্রান্ত এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। এঁদের মধ্যেই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬)। ঐ সময় পর্যন্ত বেদ যে অভ্রান্ত সেটা ব্রাহ্ম ধর্মীয় বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বিবেচিত হতো। ১৮৪৭ সালের দিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষার পর ব্রাহ্ম নেতৃবৃন্দের মনে হয় অক্ষয়কুমার দত্তের তত্বে বুল নেই। বেদের অভ্রান্ততার মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। তাই একেশ্বরবাদী ধারণা সম্বলিত উপনিষদের নির্বাচিত অংশসমূহের উপর ভিত্তি করে ব্রাহ্ম ধর্মবিশ্বাস পুনর্নিমাণের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। ব্রাহ্ম সমাজের সংশোধিত মতবাদটি ১৮৫০ সালে ‘ব্রাহ্ম ধর্ম’ অথবা ‘এক সত্য ঈশ্বরের পূজারীদের ধর্ম’ নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এটা উল্লেখ করতে হয় যে, যদিও বেদকে অস্বীকার করা হয়, তবুও ব্রাহ্ম আন্দোলনের অপরিহার্য হিন্দু চরিত্র ধরে রাখা হয়।

অক্ষয়কুমার দত্ত ভারতবর্ষে ইংরেজ মিশনারিদের ধর্মীয় তৎপরতার কঠোর সমালোচনা করেন। তবে ভারতবর্ষের কিছু মানুষ কেন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তার মনস্তাত্ত্বিক আলোচনাও তিনি করেন। তিনি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এ নৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি উইলিয়ম গর্ডন ইয়ং-এর দেওয়া চাকরি, শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি ইনসপেক্টর-এর পদ গ্রহণ করেননি। তবে ১৮৫৫ সালের ১৭ জুলাই শিক্ষক-প্রশিক্ষণের জন্য কলকাতায় নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুরোধে অক্ষয়কুমার দত্ত তার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

অক্ষুয়কুমারের জন্ম ১৮২০ সালের ১৫ জুলাই নবদ্বীপের পাঁচ মাইল উত্তরে, চুপী গ্রামে। বাবা পীতাম্বর দত্তের মৃত্যু হলে অক্ষয়কুমার দত্তের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নিজের চেষ্টায় তিনি শিক্ষা অর্জন করতে শুরু করেন। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র থাকাকালেই তিনি সেখানকার শিক্ষক হার্ডম্যান জেফ্রয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বহুভাষাবিদ পন্ডিত জেফ্রয়ের কাছে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান, ফরাসি ও হিব্রু ভাষা ছাড়াও শিখেন পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, জ্যামিতি, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, সাধারণ বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি। আমিরউদ্দীন মুন্সির কাছে শিখেন ফারসি ও আরবি। ১৮৩৮ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত-এর সঙ্গে পরিচয় হলে তিনি অক্ষয়কুমার দত্তকে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখতে উৎসাহিত করেন। এ পত্রিকায় নিয়মিত লেখার সূত্রেই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সঙ্গে অক্ষয়কুমার দত্তের পরিচয় হয়।১৮৮৬ সালের আজকের দিনে অর্থাৎ ১৮ মে তাঁর মৃত্যু হয়।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনাকালে বিনোদন দুনিয়ায় কী পরিবর্তন? জানাচ্ছেন, চলচ্চিত্র সমালোচক রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত I