সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: সরু গলি দিয়ে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছয় না। কিন্তু ওই গলিই পছন্দ হল অস্কারজয়ী পরিচালকের। আজও বর্তমান সত্যজিতের স্মৃতিধন্য সেই সরু গলি। গলির গপ্পো জানেন শুধু হাতে গোনা দু’এক জন। মুহূর্তে নস্ট্যালজিক হয়ে যান ৬০ বছর আগের সেই দিনগুলির স্মৃতি রোমন্থনে।

কলেজষ্ট্রীট থেকে হাঁটতে হাঁটতে পটুোয়াটোলা লেন। সেখানে কত-কথা নামের একটি দোকান। বেনারস থেকে কলকাতায় চলে আসা অপু শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বেড়িয়ে ঠিক এখানেই এসে দাঁড়িয়েছিল। একটি গাড়ি তার পাশ দিয়ে চলে যাবে। অপুর প্রবেশ ‘কত কথা’ দোকানের ঠিক উল্টোদিকের ৫৪ নম্বর বাড়িটিতে। বাকি ইতিহাস। অপু ট্রিলজি’র ‘অপরাজিত’ ছবিতে অপুর মেস বাড়িতে এসে ওঠা এবং তার কলেজ জীবনের বেশীরভাগ শ্যুটিংটাই হয়েছিল এই বাড়ি এবং বাড়ি সংলগ্ন গলি এবং রাস্তায়। একমাত্র ভারতীয় চিত্রনির্মাতা হিসাবে অস্কার জয়ের রাস্তাটা যেন এই গলি থেকেই আরও পাকা হয়ে গিয়েছিল।

কত কথা দোকানেই বসেছিলেন সত্তরের অশোক ঘোষ। বললেন, “তখন আমাদের ওই আট দশ বছর বয়স। তিন চার দিন ধরে শ্যুটিং হয়েছিল এখানে। স্পষ্ট মনে রয়েছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। বাড়িতে ঢোকার জন্য এই রাস্তাই ব্যবহার করা হয়েছিল। সামনেও দরজা রয়েছে। সেটাও ব্যবহার হয়েছিল।”

একইসঙ্গে তিনি বলেন, “এই ৫৪ নম্বর বাড়ির এক সদস্যও একটা ছোট্ট চরিত্রে ছিলেন। লালচাঁদ ব্যনার্জি ছিল ওঁর নাম। ওই পাকা চুল বাছার একটা দৃশ্যে ছিলেন উনি। আমার সেটা স্পষ্ট মনে রয়েছে। বাড়ির দরজার ফাঁক দিয়ে আমরা সেই শ্যুটিং দেখেছিলাম।”

গলি থেকে বেড়িয়ে রমানাথ লেন। রমানাথ লেনের প্রথম বাড়ির রোয়াকে একটা দৃশ্য ফিল্মে ছিল। সেই রোয়াক আজ আর নেই। ভেঙে গিয়েছে। সেই বাড়ির উলটোদিকেই একটি প্রেস ছিল বলে জানালেন অশোকবাবু। ওই ছোট্ট জাউগাতেও শ্যুটিং হয়েছিল। তবে সেই প্রেস আর নেই বলে জানাচ্ছেন তিনি। গোটা দৃশ্যটা এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন তিনি। মুহূর্তে তিনি ৬০ বছর আগের সেই দিনটিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁর কথাতেই রতা স্পষ্ট।

আর বিশপ লেফ্রয় ষ্ট্রীট। আজকের সত্যজিত রায় ধরণী। ব্র্যান্ড ফ্যাক্টরি, ফোরামসহ আধুনিকতার ছোঁয়া পরতে পরতে। কিন্তু বর্তমান সরকারের তৈরি করা পোস্টে ‘রায়বাবুর’ ছবির পোস্টারগুলি দেখলে মনে হতেই পারে , এই তো সেদিন এখান দিয়েই হেঁটে গিয়েছেন ব্যারিটোন গলার স্বরের মানুষটি। কিন্তু যে গলি দিয়ে হেঁটে রায় রে হলেন সেই গলির কথা ক’জনই বা জানেন? জানে শুধু কিছু বৃদ্ধের দল আর গলির বহুকাল রোদ না পাওয়া স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল।

এমনই হাজারও বাড়ি কিংবা গলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই শহরের বুকে যেগুলি টলিউড থেকে বলিউডের বিভিন্ন ছবির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ১০৩ বছরের পুরনো সেন্ট্রাল বোর্ডিং। এখানে রনবীর সিং, অর্জুন কাপুর, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অভিনীত ‘গুন্ডে’ ছবির শ্যুটিং হয়েছে। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সাইকো থ্রিলার ‘ক্ষত’ ছবির বেশ কিছু দৃশ্যের শ্যুটিং হয়েছে শতাব্দী প্রাচীন এই মেসবাড়ি দোতলার ঘরে। অনিক দত্ত পরিচালিত ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ছবির প্রচুর দৃশ্যের শ্যুটিং হয়েছে এই বাড়িতেই।

বর্তমান বোর্ডারদের কাছে সেই সব স্মৃতি স্বাভাবিকভাবেই জলের মতো স্বচ্ছ। প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ের অন্দরচিত্র দেখেই দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ব্যোমকেশের সেট বানিয়েছিলেন। এক্কেবারে কপি পেস্ট। আবার শরদিন্দুর মন পড়ার জন্য বহুবার এই মেসে হাজির হয়েছেন ব্যোমকেশের চরিত্রে একের পর এক হিট ছবির অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়।