স্বরলিপি দাশগুপ্ত- “শিব ঠাকুরের আপন দেশে আইন কানুন সর্বনেশে, কেউ যদি যায় পিছলে পড়ে, প্যায়দা এসে পাকড়ে ধরে।” তবে শুধু পিছলে পড়লেই নয়। শিব ঠাকুরেরই ছবি এঁকেও শাস্তি পেতে পারে যে কেউ। আর শিল্পীর নাম যেখানে তৌসিফ হক সেখানে শাস্তি যে অবশ্যম্ভাবী তা বলাই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকেই বলা যায়।

শিবরাত্রি উপলক্ষে একটি ছবি এঁকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তৌসিফ লিখেছিলেন, “সিক্স-প্যাক অ্যাবস শিবের আমদানি উত্তর ভারত থেকে। বাঙালির শিব ঠাকুর কখনও মাসলওয়ালা মাস্তান নন। বরং তিনি শান্ত, নম্র, গায়ের রং সাদা। মুখে গোঁফ আছে, মাথায় জটা, এ চেহারা একদম নাদুস নুদুস, ভুঁড়ি আছে। এবং তিনি সম্ভ্রান্ত চাষী, কৃষিকাজের মাঝে লাল শালু মুখে গঞ্জিকা সেবনে ব্যস্ত থাকেন। তিনি একাধারে প্রেমিক ও সৎ। অন্যদিকে দয়ালু পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক।”

তৌসিফের এই পোস্ট নিয়েই যত সমস্যা! ওড়ানো হয়েছে তৌসিফের প্রোফাইলও। হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাধারীরাই তৌসিফের প্রোফাইল উড়িয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। একজন নেটিজেন তৌসিফের পোস্টে পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘তাহলে তোমাদের মহম্মদেরও ভুঁড়ি আছে’। আর একজনকে লিখতে দেখলাম, ‘ও আমাদের শিবকে চেনাবে!’ আর একজনের কথায় আবার, ‘এত বড় সাহস! শিবকে মাস্তান বলা!’

কিন্তু সত্যি কি খুব একটা ভুল কথা বলেছেন তৌসিফ! বাঙালি শৈশব থেকে শিবকে চিরকাল আপন ভোলা, প্রৌঢ়, স্থূলকায়, পত্নীনিষ্ঠ হিসেবেই চিনে এসেছে। তবে শুধু গল্পকথায় নয়। বাংলার লোকায়ত খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে শিবের চিত্রটা আদপে এমনই।

দক্ষিণ ২৪ পরগণায় পালা গানে কিন্তু শিবকে চাষী হিসেবেই দেখানো হয়। যেমন একটি পালাগানে রয়েছে, “চাষ করিতে যায় ভোলানাথ বল্লুকা কুলে গো। কোথায় আছো গৌরী দেবী দাওনা শঙ্খের ধ্বনি গো।”

সেই পালা গানগুলিতে শিব কতটা দেবতা, তার থেকেও বেশি প্রকাশ পায় তাঁর ছাপোষা বাঙালি জীবন। চাষ আবাদের মাঝে সাধারণ ঘরের বাঙালি পুরুষের মতোই তাঁর বর্ণনা। বেশ কিছু অঞ্চলে কৃষি-কেন্দ্রিক দেবতা হিসেবেও শিব পূজিত হন। শিবকে অনার্য বলেই জানা যায়। আর তাই লৌকিক জীবন ও শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। অন্তত বাঙালির লোকায়তে শিব একজন অভাবী ছাপোষা।

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গলেও শিব খাদ্যরসিক ও আদুরে জামাই গোছের। কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্যের শিবায়ণ কাব্যেও শিবের একই চিত্র রয়েছে। সেখানে শিব কতটা ঐশ্বরিক বা পূজিত হন তার থেকেও বেশি পার্বতীর সঙ্গে তাঁর ঘরোয়া জীবনই প্রকাশ পায়। সেখানে শিবের দেবত্বের থেকেও তাঁর দাম্পত্য, চাষের কাজ ইত্যাদি ঘরোয়া জীবনই উঠে আসে।

শিল্পী যামিনী রায়ের আঁকা শিবও মোটেই সিক্স-প্যাক অ্যাবস ও সুঠাম চেহারার অধিকারী নয়। বাংলার পটচিত্রতেও শিবকে একটি নাদুস নুদুস ভুঁড়ি সমেতই দেখা যায়। এমনকী, বাংলার বিভিন্ন মন্দিরেও বাঘছাল পরা শিবকে ভুঁড়ি সমেতই দেখা যায়।

তা হলে কেন এত সমস্যা! বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতিতে শিবকে কখনও বয়স্ক বা কখনও স্থূলকায় হিসেবেই দেখানো হয়েছে। তা হলে তি তৌসিফের নামটাই যত সম্যস্যার কারণ!

এক্ষেত্রেও বলতে হয়, বাংলার সংস্কৃতি কখনওই শিববন্দনায় ধর্মের ভেদাভেদ টানেনি। বাংলার গম্ভীরা গানে বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে শিববন্দনা। সমীর খলিফার গম্ভীরা গানে রয়েছে সম্প্রীতির ছাপ। “এ যে হিন্দু মুসলমান ছিল এক আসনে যান, গলাগলি পিরিত করত গাইত গম্ভীরা গান।”

বাউল গানেও রয়েছে, কে বা জাতি, কে বা জ্ঞাতি। ও হে বান্দা পৃথিবীতে যত জীব, সর্বঘটে আছে শিব।

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও