সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এই গল্প যেন শাহরুখ খান অভিনীত স্বদেশ ছবির মোহন ভার্গবের মতো। মোহন যেমন নাসার চাকরি ভুলে দেশের জন্য থেকে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রামে নিয়ে এসেছিল বিদ্যুৎ। খানিকটা তেমনই এই গল্প। তবে সত্যি। বঙ্কিমবিহারী মাইতি কবিতা এবং কেমেস্ট্রির অদ্ভুত রসায়নে কেমেস্ট্রি সহজ হচ্ছে গ্রামের ছেলেদের। আইআইটি প্রাক্তনীর বহু নামীদামি কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে চাকরির সুযোগ এসেছিল। সব ছেড়ে দিয়ে তিনি থেকে গিয়েছেন মেদিনীপুরের গ্রামের বাড়িতে। শেখাচ্ছেন কবিতায় কেমেস্ট্রি।

এ এক অদ্ভুত রসায়ন। কবিতা এবং কেমেস্ট্রি। দুয়ের রসায়নটাকেই সহজ করেছেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ বঙ্কিমবিহারী। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবুজে ঘেরা সাউরী গ্রামেই তার বাস। সেই গ্রামের মাটিই তার কাছে ল্যাবরেটরি। সেখানে বসেই অনবরত চলছে কবিতা কেমেস্ট্রি মিশিয়ে নতুন যৌগ তৈরির পাক। যেমন অ্যালকোহলের রসায়ন মনে রাখার কবিতা। ‘অ্যালকোহল প্রস্তুতি’ নামক সেই কবিতায় লিখেছেন,

‘রূপালী জ্যোৎস্নায় ধোওয়া,
অ্যালকাইল হ্যালাইড
ঢালো ঢালো সুরাসার,
বুলবুল ডেকে হল সারা ,
তৃষ্ণার্ত এস্টার ,
পটাশের জলযোগে , কত থাকে আর?
আমি কবি খৈয়াম , উত্তপ্ত ইথারে লঘু আম্লিক যোগে মদিরার ঘোরে,
চাহি তোমারে’

আবার ‘অণুঘটক’ বিষয়টি সহজ করতে তিনি লিখেছেন,

‘আমি এক রসায়নি চিনি
সোনালি আলকগুচ্ছ তাম্র ওষ্ঠখানি
ডায়াজো রঙেতে রাঙা মুখখানি তার
গ্যটারম্যান , উলম্যান সবে হল হার’

এমনই প্রচুর কবিতা লিখেছেন তিনি। আইআইটি খড়গপুরের প্রাক্তনী হবার সুবাদে অনেক লোভনীয় চাকরির সুযোগ হাতে এসেছিলো, কিন্তু গ্রামের মাটির টানে সব সুযোগ ছেড়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের খাকুড়দা গ্রামের বড়মোহনপুর হাই স্কুলে পড়িয়েছেন কেমেস্ট্রি। তারপর বছর পনেরো হল অবিচল ভাবে গ্রামের ছাত্র ছাত্রীদের উন্নতিকল্পে রসায়নের পাঠ দান করে চলেছেন।

ছাত্রাবস্থায় আইআইটি খড়গপুরে ‘Dedicated to the service of the Nation’ (দেশের সেবায় উৎসর্গকৃত) কথাগুলি দাগ কেটেছিল। বঙ্কিমবাবুর বলেন, “ তখন থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম সাউরী গ্রামে থেকেই যদি দেশ ও দশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা যায়।” রবীন্দ্র ভাবনায় ভাবুক শিক্ষক নিজের ঘরে তুলে এনেছেন একটুকরো শান্তিনিকেতন। যেখানে খোলা হাওয়ায় পুকুরের ধারে ছাত্র ছাত্রীরা পাঠ নিচ্ছে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার আবার সেখানেই তিন বছর বয়সী ছোট্ট শিশু আবৃত্তি শিখছে ‘সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা’।

রসায়নের দুর্বোদ্ধ বিষয়গুলোকে সরল করে ছাত্র ছাত্রীদের বোঝানোর জন্য তিনি বাঁধেন কবিতা যা তাদের মনের মণিকোঠায় দীর্ঘস্থায়ী হয়ে রয়ে যায়। ছড়া বা কবিতা লেখা বঙ্কিমবাবু আয়ত্ত করেছেন তাঁর বাবা বিপিন বিহারীর কাছ থেকে। মাঠে বাড়ির ধান কাটার সময় বাবা মনের আনন্দে কবিতা বাঁধতেন আর ছেলে সেই কবিতা মনের খাতায় তুলে নিত।

বঙ্কিমবাবু বলেন , “মনে প্রাণে চেয়েছি ছাত্রছাত্রীরা লেখা পড়ার পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে বেড়ে উঠুক আর তাই রসায়নের সঙ্গে কবিতা মিশিয়ে এই ভাবনা।” লিখেছেন সময়োপযোগী একাধিক কবিতা, নাটক এবং ছোটগল্প। মহেশ্বেতা দেবীকে নিয়ে লেখা কবিতা ‘অরণ্যের মা’ বহু পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে,কলকাতা বইমেলায় সাহিত্য সৃজনীতে প্রকাশিত গ্রাম বাংলার এই কবির অস্থির সময় কে নিয়ে লেখা কবিতা ‘শেষ হাসি’, ‘মাসিপিসি’।

প্রাথমিক স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী দের নিয়ে মঞ্চস্থ করেছেন একাধিক বিজ্ঞান, পরিবেশ ও সমাজ সংক্রান্ত নাটক। তাঁর রচিত নাটক ‘সোনার কাঠি’ আকাশবাণী কলকাতায় শিশুমহল অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়েছে।তাঁর অতন্ত্য প্রিয় ছাত্র বিখ্যাত জ্যোর্তির্বিদ ডঃ নারায়ণচন্দ্র রানার কথা জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য রচনা করেছেন নাটক ‘পায়ে পায়ে পঞ্চাশ’।সাধারণ মানুষকে বিশ্ব-উষ্ণায়ন এবং পরিবেশের গুরুত্ব বোঝাতে বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে মঞ্চস্থ করেছেন মূলতঃ সচেতনাধর্মী নাটক ‘বনবাণী’ এবং ‘শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর’।রয়েছে ‘আমি নারী’, ‘মল-মঙ্গল,সাদা-পায়রা’,’এক গোছা চাবি’, ‘সন্ধিপূজা’, ‘আলোর মাঝে কন্যাশ্রী’,’ অ এর পরে আ’, ‘শাশুড়ি তরঙ্গ’, ‘কৈলাসে কাঁচা লঙ্কা’, ‘অ এ অজগর’।

নাটক রচনা এবং পরিবেশনার পাশাপাশি বঙ্কিমবাবু দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন একজন দাপুটে যাত্রাভিনেতা হিসেবওে। তার নাটকের দল ‘ভোরের পাখি’ আর যাত্রার দল ‘অমরাবতী’ নিয়ে ছুটে গিয়েছেন এবং সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন সকলকে বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতি সম্পন্ন করে তোলার জন্য।

শৈশব,কৈশোর ও যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে এই গ্রামেরই ৭৫ ছুঁই ছুঁই আই আই টি খড়গপুরের রসায়নের স্নাতকোত্তর প্রাক্তনী বঙ্কিম বিহারী মাইতি। ১৯৭০ সালে আই আই টি খড়্গপুর বঙ্কিম বাবুকে ‘এমএসসি ইন কেমিস্ট্রি’ ডিগ্ৰী প্রদান করে।

অগণিত প্রতিষ্ঠান সংবর্ধনা প্রদান করেছে বঙ্কিমবাবুকে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখার জন্য। পুরস্কারের কথা প্রসঙ্গে অজ পাড়া গাঁয়ের সাদা-মাটা এই শিক্ষকের অভিমত, ‘আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে, তোমারি ইচ্ছা করহে পূর্ণ আমার জীবন মাঝে’।