সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : ট্রাভেল ব্লগারের ছড়াছড়ি। ট্রাভেল এজেন্সির ছড়াছড়ি, ম্যাগাজিন, সোশ্যাল মিডিয়া পেজ। ঘুরতে যেতে চাইলেই হাজার হাজার হোটেল রেস্তোরাঁ তৈরি তাদের অ্যাপ নিয়ে কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগের এক বাঙালি ভ্রমণ কাহিনিকার বা ট্রাভেল রাইটারের লেখা বাঙালির ভ্রমণ পিপাসাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। তাঁর হিমালয় নিয়ে লেখা অবাক করেছিল রবীন্দ্রনাথ থেকে জওহরলাল নেহরুকে। তিনি প্রবোধ কুমার সান্যাল।

হিমালয়ের টানেই প্রবোধকুমার সেনা বিভাগে চাকরি নিয়ে পীরপাঞ্জল পর্বতশ্রেণির ‘কো-মারি’ অঞ্চলে বসবাস করেছিলেন। এখন সেটি পাকিস্তানের অন্তর্গত। ১৯৩২ থেকে দীর্ঘ পাঁচ বছর হিমালয় সন্নিহিত নানা স্থান ভ্রমণ করেন, সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, হিমালয়ের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের জীবনপ্রণালী আর নানান মানুষের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘দেবতাত্মা হিমালয়’। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থের মুখবন্ধ লিখেছিলেন জওহরলাল নেহরু। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ পাঠ করার পর রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘তোমার ভাষা পাঠকের মনকে রাস্তায় বের করে আনে’।

পড়ুন: বর্ষাকে উপভোগ করতে চাইলে ঘুরে আসুন এই জায়গাগুলো

প্রবোধকুমার মা বিশ্বেশ্বরী দেবীর হরিদ্বার-হৃষিকেশ তীর্থভ্রমণে সঙ্গী হয়েছিলেন ১৯২৩ এর অক্টোবরে, প্রবোধকুমার তখন ১৮ বছরের কিশোর। মায়ের সঙ্গে সেই যাত্রাই তাঁকে প্রথম হিমালয় চিনিয়েছিল। সেই তীর্থভ্রমণের সঙ্গী হয়ে প্রথম হিমালয় চেনা ও তার দূর্বার আকর্ষণ বোধ করলেও তার বারংবার হিমালয় ভ্রমণ তীর্থ-ভ্রমণের টানে ছিল না। তাঁর নিজের কথায়, “হিমালয় পর্যটক বলেই যে আমি তীর্থযাত্রী – একথা সত্য নয়। লক্ষ্যটা আনন্দের উপলক্ষ্যটা তীর্থের। হিমালয় কেন বারবার তাঁকে টেনে এনেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন ‘উত্তর হিমালয় চরিত’ গ্রন্থের মুখবন্ধে। “

‘দেবতাত্মা হিমালয়’ ও ‘উত্তর হিমালয় চরিত’এ অসংখ্য দেবালয় ও তীর্থস্থানের বিবরণ দিয়েছেন, সেগুলির প্রতিষ্ঠার পিছনে ইতিহাস ও পৌরাণিক পৃষ্ঠভূমির বিশ্বাসযোগ্য বৃত্তান্ত শুনিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন , “হিমালয়ের সকল তীর্থদেবতা দর্শন মোটামুটি দশ বছরেই শেষ হয়, কিন্তু বত্রিশ বছরেও আমার কাছে হিমালয় শেষ হয়নি”। ১৯৩২ এ কেদারবদ্রী ভ্রমণ ও তারপর হৃষিকেশ থেকে পার্বত্য শহর রাণীক্ষেত পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে পরিক্রমণ করেছিলেন ৩৮ দিনে। সেই অভিজ্ঞতার কাহিনি নিয়েই লিখেছিলেন ‘মহাপ্রস্থানের পথে’।

পড়ুন: মুসলিম হয়েও পাকিস্তান নয়, ভারতীয় বায়ুসেনাকেই বেছে নিয়েছিলেন এই অফিসার

প্রবোধ কুমার সান্যালের ‘দেবতাত্মা হিমালয়’এর রচনাকাল ১৯৫৪। হিমালয়ের মূল মেরুদন্ড দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মিরের শেষপ্রান্তে হিন্দুকুশের সঙ্গে মিলেছে। হিমালয়ের সেই মেরুদন্ডের দুই পার ছিল তাঁর ভ্রমণের পথ। সাতটি পার্বত্য ভূভাগে দুর্গম অঞ্চল সহ বিস্তীর্ণ পথ পরিক্রমণের বৃত্তান্ত লিখেছেন উত্তর ‘হিমালয় চরিত’ গ্রন্থে। সেই ভ্রমণ-কথায় মিশে আছে সেইসব অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাস, পৌরাণিক কথা, নানান জাতি ও সমাজের স্তরবিন্যাস, শ্রেণী, বর্ণ ও ভাষার কথা, তাদের লোকাচার ও দৈনন্দিন যাপনের বিশ্বস্ত ছবি।

প্রবোধকুমারের বত্রিশ বছরের বারংবার হিমালয় পরিক্রমণের সেরা ফসল তার দুই খন্ডের গ্রন্থ ‘দেবতাত্মা হিমালয়’। হিন্দুকুশ উপত্যকা থেকে পার্বত্য আসাম পর্যন্ত হিমালয়ের যে বিস্তৃত ভৌগোলিক উত্তর-প্রাচীর তার প্রত্যেকটি ভূভাগই তাঁর ভ্রমণের মধ্যে এসেছে। চব্বিশটি পর্যায় ভাগ করে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত সন্নিবেশিত করেছেন ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থে। এত ভ্রমণ অভিজ্ঞতার পরেও তিনি বলতেন, “মানুষের এক জন্মে সমগ্র হিমালয় আনুপূর্বিকভাবে ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ কাজ আয়ুষ্কালের একশো বছরেও কুলায় না”। সেই জন্যই হয়তো তাঁকে প্রকৃত ট্রাভেল রাইটার এবং পর্যটক বলা যায়।

পড়ুন: ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী ভিয়েতনামের জন্ম

এ নিয়েও আবার বিতর্ক রয়েছে কারণ, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। প্রবোধকুমার সান্যালের সমসাময়িক লেখক। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ভ্রমণ-রচনা ‘গঙ্গাবতরণ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ তে, প্রবোধ কুমার সান্যালের ‘দেবতাত্মা হিমালয়’এর রচনাকাল ১৯৫৪। এমন কি, উমাপ্রসাদের প্রথম হিমালয় দর্শন, ঐ নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী ১৯২৮ এ, প্রবোধকুমার হিমালয়কে প্রথ চেনেন ১৯২৩-এ।

১৯৩০ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বহু পাঠকবন্দিত উপন্যাস ও গল্পের স্রষ্টা প্রবোধকুমার। তাঁর কাহিনি অবলম্বনে বহু সফল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে, কাঁচ কাটা হীরে, পুষ্পধনু, প্রিয় বান্ধবী ইত্যাদি। মূলত কল্লোল যুগের সাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত প্রবোধ কুমার। পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার।