সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারি। কাদের রক্তে রাঙানো, রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক। কে না জানে, তাঁদের কথা। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম শুনেছেন? খুব সহজ উত্তর আসবে। না। তিনিই সেই কংগ্রেসি পাক নেতা যার প্রাণ গিয়েছিল এই বাংলা ভাষার হয়ে লড়াইয়ের জন্য।

বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে একটু পিছনে ফিরে যাওয়া যাক। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে করাচির জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়েছিল। নব্য গঠিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবলমাত্র উর্দু ও ইংরেজি। এই ভাষাতেই সবাইকে কথা বলতে হবে। একপ্রকার জোরজুলুম। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববঙ্গে বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ বেশী। তাঁরা কেন মেনে নেবে এমন সিদ্ধান্ত? পূব পাকিস্তান জুড়ে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা দেয়। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলা ভাষার প্রশ্নে পাক প্রধানমন্ত্রী তথা তাদের জাতির জনক মহম্মদ আলি জিন্নার চোখে চোখ রেখে প্রথম বাংলা ভাষার অধিকারের দাবি তোলেন কুমিল্লার স্বাধীনতা সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

কী বলেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ? বলেছিলেন, ‘সংকীর্ণ প্রাদেশিকতাবাদী স্বার্থ থেকে নয়, গণপরিষদের সদস্যদের তরফে পূর্ণ বিবেচনার আশায় এই বক্তব্য রাখছেন তিনি। বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা সত্য, কিন্তু তৎসত্ত্বেও বাংলা এই নবগঠিত রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দেশের ছ’কোটি নব্বই লক্ষ মানুষের মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষ কথা বলেন বাংলা ভাষায়। তাহলে, এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত? রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ভাষা হওয়া উচিত সেই ভাষাই, যা এই রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ব্যবহার করেন। এই যুক্তিতেই আমি মনে করি, আমাদের রাষ্ট্রের সাধারণ সংযোগের ভাষা হওয়া উচিত বাংলা।’ তিনি আরও বলেছিলেন ,’আমি জানি, আমি আমার দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের আবেগের কথাই এখানে প্রতিধ্বনিত করছি আর তাই বাংলাকে কখনোই শুধু একটি প্রাদেশিক ভাষার মর্যাদা দেওয়া উচিত নয়, বাংলাকে রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবেই মর্যাদা দেওয়া উচিত। আর তাই, আমি অনুরোধ করব ২৯ নম্বর বিধিতে ‘ইংরেজি’ শব্দের পরে ‘বাংলা’ শব্দটি যোগ করা হোক।’

ধীরেন্দ্রনাথের বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরের তফশিলি উপজাতির নেতা ও রাজবংশী সমাজের প্রথম আইনজীবী প্রেমহরি বর্মণ। এর বীরুধে লিয়াকত আলি বলেছিলেন, ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছেন। শুধুমাত্র উর্দুই দুই পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে।’ এরপর থেকে আন্দোলন চলতে থাকে। ততদিনে পাকিস্তানে জুড়ে উরদু না বললেই মার শুরু হয়ে গিয়েছে। ধীরেন্দ্রনাথের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই বাহান্নর ভাষা আন্দোলন আবার নতুন ধারন করে। এবার নতুন দাবী নিয়ে আসেন তিনি। এবার দাবী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং তখন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। এতদসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এ্যাডভোকেট আবদুল করিমের তত্ত্বাবধানে ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদেরকে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র ভাষার দাবিতেই প্রাণ গেল এই বাঙালির। ভাষার দাবীতে প্রথম শহীদ বললেও ভুল হয় না।

প্রসঙ্গত, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম ও সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের টিকিটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ওই বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। এরপর যা হয়েছে তা ইতিহাস।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।