সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : আপনার সুখ গিয়েছে চুরি? কিছুই ভালো লাগছে না? গান শুনুন। এটাই হবে আপনার অসুখে সুরে সুখ দেওয়ার এক এবং একমাত্র সহজ উপায়। অন্তত অর্থপেডিক চিকিৎসক সুমন্ত ঠাকুরের দাওয়াই এটাই। গত ১২ বছর ধরে বহু মানুষের অসুখে সুরে সুখ দিচ্ছেন তিনি। সুখের সুর বাঁধার অস্ত্রের পোশাকি নাম মিউজিক থেরাপি।

উত্তর ২৪ পরগণা জেলার নার্সিংহোমের একটি ঘরে বসে সুমন্ত ঠাকুর সুখের সুর বাঁধেন। কথায় কথায় জানা গেল তিনি আবার বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ভি.বালসারার ছাত্র। সঙ্গীত তাঁর রক্তে। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি অমোঘ টান। চেম্বারের মধ্যেও কিশোর-আর.ডির ছবি রাখা। বোঝা দায় এ কোনও চিকিৎসকের চেম্বার না কোনও সঙ্গীত প্রেমীর বা শিল্পীর ঘর।

আসলে চেম্বারের মধ্যে থরে থরে সাজানো এক তারা, কি – বোর্ড, গিটার, বিভিন্ন ধরনের মিউজিক প্লেয়ার। এগুলোই অর্থপেডিক চিকিৎসকের সর্বক্ষণের সঙ্গী। ছুরি, কাঁচি, ব্যান্ডেজের বদলে এগুলোই তাঁর অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করে তোলার ডাক্তারি যন্ত্রপাতি।

সুমন্ত ঠাকুর বলেন , “১৯৯৮ সালে খবরের কাগজে পড়েছিলাম সুদূর আমেরিকায় মিউজিক থেরাপি নিয়ে কাজ হচ্ছে। ডাক্তারি পড়তে গিয়ে সঙ্গীত বাদের খাতায় পড়েছিল। শুধু মনে ছিল স্যার বলেছিলেন মিউজিককে মানুষের স্বার্থে কাজে লাগাতে। এটা নিয়ে পড়াশোনা করার পর আমার মনে হয়েছিল এটাই সেই সুযোগ। মিউজিক হল বিনোদন। বিনোদনকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে শুরু করি ২০০৭ সালে। সঙ্গীত ভালোবাসতাম তাই মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ খুব একটা সমস্যার হয়নি।” তারপর থেকেই অসাধারণ প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে।

চিকিৎসক বলেন , “আমি নিজের চোখের সামনে নিজের কাজের ভালো ফল হতে দেখেছি। সঙ্গীতের এ এক বিজ্ঞানসম্মত প্রয়োগ বলে আমি মনে করি। রোগীর মনে অপারেশনের আগে যে ভয় থাকে , চিন্তা থাকে সেটা সম্পূর্ণ চলে যায়। তার মন আটকে থাকে গানের সুরে। ফলে একজন রোগীকে অ্যানাস্থেসিয়া করে অপারেশন করতে যে পরিমাণ ওষুধ বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার করতে হয় এক্ষেত্রে সে সব কিছু করতে হয় না । খরচ অনেকটা কমে যায়। দুভাবেই মানসিক চাপ কমে। “

সুমন্ত ঠাকুরের কথায় , “আমার কাছে যখন কোনও রোগী আসে বা তার অপারেশন করতে হয় তখন প্রথমে তাকে জিজ্ঞাসা করি কি গান শুনতে ভালো লাগে। অনেকে অবাক হয়ে যায় কিন্তু এটাই করি। তারপর পছন্দ মতো গান চালিয়ে দিয়ে আমি আমার কাজ করতে থাকি। গানের সঙ্গে দেখেছি আমার রোগীও গান গাইতে শুরু করে দিয়েছে। তার মানে তার মন পুরোপুরি অন্যদিকে চলে গিয়েছে এবং সে অপারেশনের মতো একটা ভয় পেয়ে যাওয়ার মতো বিষয়টা রীতিমত এনজয় করছে।”

এদিন তাঁর সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন চিকিৎসকের হাতে সুস্থ হওয়া এক মিউজিশিয়ান। যার কলার বোন দুর্ঘটনায় পাঁচ টুকরো হয়ে গিয়েছিল। পার্থসারথী কুণ্ডু নামে সেই মিউজিসিয়ান নিজেই জানালেন , “আমার কোনও সমস্যাই হয়নি। আমার কোনও খেয়াল ছিল না যে আমার একটা মেজর অপারেশন রয়েছে। আমি তো মিউজিকের তালে অপারেশন টেবিলেই বাজনা বাজাচ্ছিলাম।” খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কাজে ফিরেছেন। এখন দেশে বিদেশে ফের যাচ্ছেন গিটার বাজাতে। এমনই সঙ্গীত তরঙ্গের গুন। ২১ জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। এমন দিনে মিউজিক থেরাপিকে সুমন্ত ঠাকুর সবরকম সমস্যা , ভীতি, জড়তার ওষুধ হিসাবে দেখতে চাইছেন।