সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘জয় শ্রী রাম বলব না, হিন্দু রাষ্ট্র হতে দেব না’ এই দাবী নিয়েই পথে নামলেন ওঁরা। না ওঁরা তৃণমূল নয়, সিমিএম নয়। নয় কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ। ওঁরা কিছু ‘সংখ্যালঘু’ মানুষ যারা বলতে চাইছেন, মান আর হুঁশ থাকলে তাঁরা ‘জয় শ্রী রাম বলবেন না, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হতে দেবেন না’।

এই বার্তা সমস্ত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কলকাতার হাজরা মোড়ে হাজির হয়েছিলেন তাঁরা, সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী সরকারের সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক ধর্মীয় ঘটনার জেরে বিভিন্ন মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার প্রমাণ।

আরও পড়ুন- সবুজ ‘ধ্বংস’ করেই পরিবেশ বাঁচাতে নামল একদল পড়ুয়া

এদিনের পথ সভায় উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন সুজাত ভদ্র, সারুর আলমরা। মঞ্চের পাশে প্রতীকী হিসাবে তুলে ধরা হয় তাবরেজ আনসারির মর্মান্তিক ঘটনা। ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা তাবরেজ আনসারিকে চোর তকমা দিয়ে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে অকথ্য অত্যাচার করার সময়ে জোর করে ‘জয় শ্রী রাম’ বোলানোর চেষ্টা হয়।

সেই ছবি যেন ভারতের সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে তা দেখানোর জন্য প্রতীকী তাবরেজের ঘটনাকে দেখানো হয়। বস্তার সলিডারিটি নেটওয়ার্কের তরফে জানানো হয়েছে, “কিছুদিন আগে সংসদে শপথ গ্রহণের সময়ে কীভাবে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান তুলেছিল বিজেপি সাংসদরা, আর তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সংসদের মেঝেতে ধীরে ধীরে খসে পড়েছিল ভারতীয় গণতন্ত্রের মুখোশ। কার্যত, হিন্দু মৌলবাদী নেতাদের দেওয়া সেই হিংসার ছাড়পত্রকে হাতিয়ার করেই আবারও নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হল আমাদের দেশের সহনাগরিক তাবরেজকে। কি দাবী? না জয় শ্রী রাম বলতেই হবে। এই অন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া যায় না। বলতে হলে মন থেকে বলব। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া জিনিস কেন কেউ বলতে যাবে? কেউ না বললে তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে? এ কেমন নীতি? এ কেমন নতুন ভারত?” এই প্রশ্নই কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।

২২ জুন, জয় শ্রী রাম বলতে অস্বীকার করায় শিয়ালদহগামী ক্যানিং লোকালে এক দল কট্টরবাদীদের হাতে আক্রান্ত হন শাহারুখ হালদার নামে এক ব্যক্তি। নির্মমভাবে মারধোর করার ঘটনা ঘটে ট্রেনের মধ্যেই। সেই ঘটনার প্রসঙ্গও এদিনের সভায় বার বার উঠে এসেছে।

সুজাত ভদ্র বলেন , “জয় শ্রীরাম বললেই তুমি দেশ প্রেমী না হলেই দেশদ্রোহী! গরু কে ভালবাসলেই তুমি দেশি খেলেই তুমি পাকিস্তানি? এই নতুন ভারত তো আমরা ভাবিনি। ২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই মোদী বলেছিলেন তাঁরা ২০২৪ পর্যন্ত ক্ষমতাতে থাকছেনই। কিভাবে এতটা নিশ্চিত হওয়া যায়? আর যদি নিশ্চিত হওয়াই যায় তাহলে এমন ঘটনা কেন? কি করছেন কি ভাবছেন প্রধানমন্ত্রী? তিনি তো বলে দিয়েছেন ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’। জয় শ্রী রাম বললে তবে কি ‘সাথ আর বিকাশ’ দেবেন তিনি?”

সারুর আলম বলেন , “পহলু খান, আফরাজুল, জুনেইদ আর এখলাকের রক্তের দাগ আমাদের স্মৃতিতে এখনও টাটকা। এরই মধ্যে, একদিকে সংসদে উচ্চারিত জয় শ্রী রাম ধ্বনি আর শাহরুখ-তাবরেজদের উপর নেমে আসা এই আক্রমণ, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ঠিক কতখানি সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে ভারতের গণতন্ত্রের অভিমুখ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটু একটু করে। সুতরাং, আসুন আমরা সবাই সর্ব জাতি ধর্ম ভুলে আমরা এক হই। এই অনাচারের বিরুদ্ধে এবার রুখে দাঁড়াই।” তাঁর কথায় , “আব নেহি তো কব”। আয়োজকরা দাবী, জয় শ্রী রাম ধ্বনিকে সামনে রেখে আসলে একটি অসামাজিক, আক্রমণাত্মক ও মৌলবাদী সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। তাদের লড়াই এর বিরুদ্ধেই।

ইতিহাসবিদের মতে, রামায়ণের নায়ক রাম মোটামুটি ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করেন। মূলত তুর্কি ও মুঘলদের শাসনকালেই, উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক হিন্দু শাসক মুঘলদের ‘বিদেশি’হিসেবে চিহ্নিত করে, আর্যদের গৌরব পুনঃপ্রচার করতে রামকে আঁকড়ে ধরেন।

আবার দেখা যাচ্ছে, সম্রাট আকবরের আমলেই রামায়ণের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রচলিত রূপ তথা ‘রামচরিতমানস’রচিত হয়, এছাড়াও একাধিক ভাষা, আখ্যান ও আঙ্গিকে রামায়ণের একাধিক রূপ প্রকাশিত হয়। ঔরঙ্গজেবের সময়ে রামকে ধরে বাঁচার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। উত্তর ভারত জুড়ে রামকে পুজো করার জন্যে একাধিক মন্দির নির্মিত হয়।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর, ব্রিটিশ শাসনকালের প্রথম দেড়শো বছরে রামায়ণ অথবা রামের প্রচার সম্বন্ধে কোনও নতুন ঘটনার তথ্য মেলে না। ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে ১৯২০ সাল নাগাদ রাম ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। শ্রীধর বলওয়ন্ত যোধপুরকার তথা ‘বাবা রামচন্দ্র’-এর হাত ধরে।

অধুনা উত্তরপ্রদেশের অন্তর্গত প্রতাপগড়, ফৈজাবাদ ও রায়বেরেলি জেলার কৃষকদের জীবনের দুঃখ দুর্দশা শুনতে শুনতে বাবা রামচন্দ্র তাঁদের গেয়ে শোনাতেন তুলসীদাসি রামায়ণ। সেই সময়েই ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে কুশল বিনিময়ের সময়ে ‘সিয়া-রাম’ বা ‘সীতা-রাম’ বলার যে প্রচলন শুরু হয়। ‘বাবা রামচন্দ্রে’র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কৃষক জমায়েতের ছোট্ট অঙ্গ ধীরে ধীরে স্লোগানের আকার ধারণ করে। পাশাপাশি, যেকোনও বিপদে পড়শিকে সচেতন করার জন্যেও ব্যবহৃত হতে থাকে এই স্লোগান।

অর্থাৎ রাজনৈতিক গণ্ডিহীন ভারতে রামকে আঁকড়ে চলেছে বাঁচার লড়াই। ব্রিটিশ যুগের শেষের দিকে তা হয়েছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অস্ত্র। সেই পর্ব চুকে গিয়ে মোদী সাম্রাজ্যে তা অত্যাচারের হাতিয়ার হয়ে উঠছে বলে দাবী প্রতিবাদীদের। যার পরিবর্তন দরকার বলে মনে করছেন তাঁরা।