১৯৫৫-র অক্টোবরে ঋত্বিক ঘটকের হাতে এসে পৌঁছে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ খারিজের চিঠি।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর প্রথম নাটক কালো সায়র লেখেন ১৯৪৮ সালে। একই বছর তিনি নবান্ন নামক পুণর্জাগরণমূলক নাটকে অংশ নেন। আর ১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ) যোগদান করেন। এসময় তিনি নাটক লেখেন, পরিচালনা করেন ও অভিনয় করেন এবং বের্টোল্ট ব্রেশ্‌ট ও নিকোলাই গোগোল-এর রচনাবলি বাংলায় অনুবাদ করেন।

এরপর ১৯৫৪-তে আই.পি.টি.এ-র সাংস্কৃতিক শাখার কলকাতার সাউথ স্কোয়াড প্রস্তুতি নিচ্ছিল গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথ্‌’-এর মঞ্চস্থ করার জন্য।সেই সময় পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের আহ্বানে সুরমা ঐ নাটকের একজন অভিনেত্রী হিসাবে এমন উদ্যোগের জড়িয়ে পড়েন।এই কাজের রিহার্সালপর্ব চলাকালীন একদিন ঋত্বিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি সি.পি.আই. দলীয় সেক্রেটারি অজয় ঘোষ। বহুক্ষণ ধরেই দুজনের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল সেদিন গণনাট্যের সাংস্কৃতিক মঞ্চের অনুসৃত নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে। ওইদিন সুরমা ঘটকের মনে হয়েছিল অজয় ঋত্বিকের মতামতের সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহমত পোষণ করেছিলেন।

এদিকে আবার সেই সময় সুরমা লক্ষ্য করেছিলেন, কাজের বাইরে কখনো ঋত্বিক মগ্ন গভীর চিন্তায়, কখনো বা ঘুরছেন লেনিন-প্লেখানভের বই হাতে। এমন অবস্থার কারণটাও জানিয়েছিলেন৷ আসলে ঋত্বিক তখন ইতিমধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পন্থা বা লক্ষ্য বিষয়ে একটি গবেষণাধর্মী খসড়া পান্ডুলিপি তৈরি করে ফেলেছেন। পরে সুরমা, মুমতাজ ও ঋত্বিক স্বয়ং এই ডক্যুমেন্টে স্বাক্ষর করেন, যা দেশের নানা প্রান্তে পার্টির বিভিন্ন স্তরের সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পার্টির ‘সেন্ট্রাল কমিটি’-তে তা আগেই জমা পড়েছিলো। আর তা করার প্রতিক্রিয়ায় আই.পি.টি.এ-র সাউথ স্কোয়াড সুরমাকে ঋত্বিকের সংস্রব ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিল। এর কিছুদিন বাদেই ঋত্বিকের কাছে পৌঁছল পার্টির সদস্যপদ খারিজের চিঠি৷

তবু অবিচল থেকেছেন তিনি। একে একে মুক্তি পেয়েছে তাঁর ছবি অযান্ত্রিক, বাড়ি থেকে পালিয়ে, মেঘে ঢাকা তারা , কোমল গান্ধার এবং সুবর্ণরেখা ৷তারপরে এক দশকের ব্যবধানে আবার তিতাস একটি নদীর নাম৷ তারপর তাঁর শেষ চলচ্চিত্র যুক্তি তক্কো আর গপ্পো যা অনেকটা আত্মজীবনীমূলক ৷কিন্তু তাঁর প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ (১৯৫২-৫৩) সময় মতো দিনের আলো দেখেনি, তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭৭ মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি ৷

ঠিক তেমনই কোনও অজ্ঞাত কারণে সেই মহামূল্যবান থিসিসও বহুদিন ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে গিয়েছিলো। অবশেষে ১৯৯৩-তে রাজ্যের তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের মন্ত্রী থাকাকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পার্টি অফিসে পুরোনো ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে বের করে ফেললেন ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ের এই দলিলটিকে৷ অবশ্য এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে৷পাশাপাশি এদেশের কমিউনিস্টরাও ভাগ হয়েছে দফায় দফায়৷ পরে যখন ইতিহাসের এমন দলিল স্বরূপ সেই হারানো ‘থিসিস’ খুঁজে পাওয়া গেল তখন সেটিকে সুরমা ঘটকের হাতে তুলে দেওয়া হয়৷ তারপরে ‘ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে সেটিই বই রূপে প্রকাশিত হয়েছিল ‘On The Cultural Front’ নামে ৷

প্রতিবেদন – সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
(তথ্য ও ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

- Advertisement -