সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : চলতি কথায় বলে, বাঙালি তিন খাবার। কী? ‘বিড়ি, মুড়ি আর তাড়ি’। লকডাউনের মহা গেরোয় অন্তত সপ্তাহ দুয়েকের কাছাকাছি বাজার থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে বাঙালির খাদ্য তালিকার অত্যন্ত প্রিয় দুই বিড়ি আর মুড়ি। গ্রামীণ মানুষ বলছেন, তাড়ি তো বানিয়েই ফেলা যায়। কিন্তু বিড়ি , মুড়ি তো সবসময় বাড়িতে তৈরি সম্ভব নয়। শহরে তা তো আরই অসম্ভব। সবমিলিয়ে মহা সমস্যায় মানুষজন। সঙ্গে বিড়ি ও মুড়ি নিয়ে ঢালাও কালোবাজারিও চলছে।

চাল , ডাল মিলছে বলে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বিড়ি মুড়ির অতিরিক্ত দামে বিক্রির ঘটনা। কিন্তু বাস্তব এটাই যে এক কিলো মুড়ি কিনতে গেলে যেখানে ৪৫ টাকা দিতে হত এখন তা দিতে হচ্ছে ৯০ টাকা। কেউ বিক্রি করছেন ৭০ টাকায়। কেউ আবার এত দাম দিতে রাজি নন। তাই অন্য দোকানে খোঁজার চেষ্টা করছেন । কম দামের খবর পেলেও শেষ পর্যন্ত কম দামের মুড়ির দোকানে দ্রুত স্টক শেষ হছে। খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। যে বা যিনি মুড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তাঁর বগলদাবা মুড়ির প্যাকেটের দিকে বাকিদের লোলুপ দৃষ্টি থাকছে। অনেকের মুখে নানা প্রশ্নের ছাপ। ভাবটা এমন যেন ‘কোথা থেকে পেল এই মুড়ি?’ অনেকে থাকতে না পেরে মুড়ি নিয়ে বিশ্ব জয় করা চেহারা নিয়ে ঘরে ফেরা ব্যক্তিকে বহুমূল্য প্রশ্নটা করেই ফেলছেন যে , ‘দাদা। মুড়ি পাই কোথায়?’

আসা যাক বিড়ির কাহিনীতে। সামান্য পাঁচ টাকার ভটচাজ লাল সুতোর বিড়ি এখন ১১ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। যে দিতে রাজি হচ্ছেন না তাঁকে দোকানদার তো রীতিমত মেজাজ দেখিয়ে বলেই দিচ্ছেন, ‘খেতে হলে খান, না হলে……; স্রেফ এখান থেকে ফুটে যান। এটা না বললেও মুখের আবভাবে তা স্পষ্ট।

বড় বিড়ির প্যাকেট তো আরই নেই । ২০ থেকে ২৫ টাকায় এক প্যাকেট চারমিনারের মত দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে বিড়ি। যারা আবার পেটের জ্যাম খুলতে বিড়িকে অব্যর্থ ঔষধি বলে মনে করেন তারা নিরুপায়। বলছেন , ‘বেশি তো কি? আকালের সময় যা পাই তাই খাই। মনটা তো ভালো থাকবে।’

গ্রামের দিকেও মুড়ির একইরকম আকাল। বাসিন্দারা বলছেন, অনেকেই মুড়িতেই প্রাতরাশ সারেন। আবার সন্ধ্যায় এক বাটি মুড়ি খান। দুপুরে রাতে ভাত বা একবেলা ভাত রাতে রুটি। গড়পরতা পুরুষ মহিলার এটাই খাবারের রোজ নামচা। সেই মুড়ি না মেলায় সমস্যায় পড়েছেন অনেকেই। আগে গ্রাম বাংলায় বাড়িতে বাড়িতে মুড়ি ভাজা হতো। কিন্তু এখন সেই চল আর নেই। এখন মুড়ি কিনে খেতেই অভ্যস্ত সকলে। বাসিন্দাদের চাহিদার কারনে বর্ধমানে বেশ কয়েকটি মুড়ি কারখানা রয়েছে। সেই কারখানাগুলি থেকে দোকানে দোকানে মুড়ি আসে। লক ডাউনের কারণে বন্ধ মুড়ি কারখানাগুলি। সেখানে একসঙ্গে অনেকে কাজ করে। তা থেকে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে। লক ডাউনের কারনে শ্রমিকরা যেতেও পারছে না। তার ওপর জেলা প্রশাসন রাইস মিল সহ সব কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তাই উৎপাদন না হলে মুড়ির যোগান স্বাভাবিক হচ্ছে না বলে মনে করছেন।

বাসিন্দারা বলছেন, মুড়ি দক্ষিণ বঙ্গের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মধ্যে অন্যতম। খাদ্য প্রক্রিয়া করণ শিল্প জেলা শাসকের অনুমতি সাপেক্ষে চালু রাখা যায়। তাই বাসিন্দারা যাতে প্রয়োজনের এই খাদ্য সামগ্রী পায়, বাজারে যাতে তার সরবরাহ ঠিক থাকে তা দেখুক প্রশাসন। অন্যান্য টিফিন তৈরিতে সময়ও লাগে। মুড়িতে সেসবের ব্যাপার নেই। এই টিফিনের খরচও অনেক কম। সহজ পাচ্য হওয়ায় বয়স্কদের অনেকে রাতে ভাত রুটির বদলে নিয়মিত মুড়ি খান। অনেকে অসুস্থতার সময় মুড়ির ওপর নির্ভরশীল। মুড়ি না মিললে অনেকেই সমস্যায় পড়বেন।