শেখর দুবে, কলকাতা: সম্প্রতি ভারতবর্ষের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিই হয়ে উঠেছে বিরোধিতা। তা সে সরকারপক্ষই হোক বা বিরোধীপক্ষ। কেউ কারো কোনরকম পরামর্শ শুনতে রাজী নয় আজ। এরূপ পরিস্থিতিতে সেই মানুষটাকে খুব মনে পড়ে যিনি ভারতকে বুঝিয়েছিলেন, “রাজনীতি মে মতবিরোধ চল সকতা হ্যায়, লেকিন মনবিরোধ নহি।”


২৫ ডিসেম্বর ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও ভারতরত্ন অটলবিহারী বাজপেয়ীর ৯৪তম জন্মদিন যিনি ভারতকে শিখিয়েছিলেন বিরোধী ও সরকারের মধ্যেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকতেই পারে।

১৯৯৪ সাল, কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে পিভি নরসীমা রাও৷ কাশ্মীরদের উপর ভারতের অত্যাচারের বিষয় নিয়ে ইউএনওর হিউমেন রাইটস কমিশনে অভিযোগ করছেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো৷ UNO থেকে ডাক পড়ল৷ ভারত জবাবদিহি করো, তুমি কেন নাক গলালে? এত লোক মারা গেল। পার্লামেন্টে কংগ্রেস সরকারের রুদ্ধদ্বার বৈঠক। কে যাবেন?


এই প্রশ্নের জবাবকে গুছিয়ে দিতে পারবেন? কংগ্রেসের মন্ত্রিসভার সবাই মিলে ঠিক করলেন এর জবাব একজনের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব৷

সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের ফোন গেল ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির এক কবির কাছে৷ তিনি অবশ্য কংগ্রেসের কেউ নন! বরং সংসদের বিরোধী আসনে বসে যে মানুষটি একাধিক রাজনৈতিক ইস্যুতে শাসক দলকে নাস্তানাবুদ করে দিতেন সেই অটল বিহারী বাজপেয়ীকে পাঠানো হল জেনেভার মানবাধিকার সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধি করে৷ সঙ্গে ছিলেন সরকার পক্ষের সলমান খুরশিদ, ফারুখ আবদুল্লা৷


জেনেভাতে অনুষ্ঠিত মানবাধিকার সম্মেলনে পাকিস্তান সরকারের ওঠানো অভিযোগের কড়া ও বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দিয়ে কংগ্রেস সরকার তথা ভারতের মুখরক্ষা করেন অটলজি৷ এর মাধ্যমেই ভারতীয় রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় ঘটনার জন্ম দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও এবং তৎকালীন বিরোধী দলের অন্যতম বড় মুখ অটলবিহারী বাজপেয়ী৷


যদিও পরে মজার ছলে অটলজি বলেছিলেন, ‘‘ওই সময় অনেকে আমাকে বলেছেন নরসীমা রাও আসলেই চালাকি করেছেন৷ বিশ্বের কাছে বার্তা দিলেন দেশের যে কোনও বিষয়ে সরকার বিরোধী একতা রয়েছে৷ পাশাপাশি যদি ওখানে আমি ব্যর্থ হতাম তাহলে বিরোধী বিজেপি কেন্দ্রের সরকারকে আক্রমণ করতে পারত না৷’’


এরকম প্রচুর ঘটনা ছড়িয়ে রয়েছে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সারা জীবন জুড়ে৷ প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর একটি ছবি টাঙানো থাকত ভারতীয় পার্লামেন্টে৷ অটলজি তখন কেন্দ্রেরমন্ত্রী হঠাৎ দেখলেন নেহরুর ছবিটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে পার্লামেন্ট থেকে৷ মন্ত্রিসভার বৈঠকে সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন, ‘‘নেহরুজীর ছবি কোথায়?’’ সেই প্রশ্নে এতটাই জোর ছিল পরেরদিন একই স্থানে ফিরে এসেছিল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ছবি৷

রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও হিন্দি সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত কবি ছিলেন বাজপেয়ীজী। মৃত্যুকে অলিঙ্গন করার অনেক আগেই যিনি অমরত্ব লিখেছিলেন,

মৃত্যুর বয়স কত?
দু-টো মুহূর্তও নয়
জীবন বহমান নদী,
মুহূর্তকে কেন ভয়?

আমি স্পর্শ করেছি সবটুকু জীবন
স্বাগতম তোমায় মৃত্যু-মরণ-জয়
ফিরবো আবার, কিসের ভয়।
(অটল বিহারী বাজপেয়ীর একটি হিন্দি কবিতার অনুবাদ করেছেন লেখক)