সুমন বটব্যাল, কলকাতা: খাতায় কলমে কংগ্রেসই এখনও এরাজ্যের প্রধান বিরোধীদল৷ অন্তত শেষ বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে৷ কিন্তু তা আর কতদিন? সাম্প্রতিক কয়েকটি ভোটের ফলাফলের জেরে এমনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে৷

কোচবিহার, কাঁথি, সবংয়ের পর নোয়াপাড়া ও উলুবেড়িয়া নির্বাচনেও নজিরবিহীনভাবে নিজেদের ভোট ব্যাংকে ঝড় তুলে ইতিমধ্যেই রাজ্যের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ছাপ রাখতে শুরু করছে গেরুয়া শিবির৷ লক্ষ্মীবারের সন্ধেয় টেলিফোনের অপরপ্রান্ত থেকে গেরুয়া শিবিরের সেই দাবিকে কার্যত ‘মান্যতা’ দিলেন স্বয়ং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী৷ তাঁর অপকট স্বীকারোক্তি, ‘‘যেদিন থেকে কংগ্রেস-সিপিএমের জোট ভেঙে গিয়েছে, সেদিন থেকেই বিজেপি প্রধান প্রতিপক্ষের ফায়দা তুলতে শুরু করছে৷’’

এক্ষেত্রেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চক্রান্ত’ দেখছেন অধীর৷ তাঁর কথায়, ‘‘কংগ্রেস-সিপিএমের মতো একটা ধর্মনিরপেক্ষ জোট ভেঙে যাওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুবিধে হয়েছে৷ উনি এটাই চেয়েছিলেন৷ উনি বরাবরই মেরুকরুণের রাজনীতি করে বিরোধী ভোট ভাগাভাগি করে দিতে চেয়েছেন৷’’ অধীরের ব্যাখ্যা, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও চান রাজ্যের বিরোধী শক্তি হিসেবে বিজেপি আত্মপ্রকাশ করুক৷ কারণ, বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দলকে বাংলার মানুষ কখনই ক্ষমতায় আনবেন না- এটা উনি ভাল করে জানেন৷’’

উলুবেড়িয়া লোকসভা কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনে বিজেপি যেখানে লক্ষাধীক ভোট বাড়িয়ে প্রায় তিন লক্ষের অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলেছে সেখানে দিনভর নোটার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট মাত্র ২৩হাজার ১০৮টি৷ স্বভাবতই এপ্রসঙ্গে শাসক থেকে গেরুয়া শিবিরের নেতারা কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে তীব্র কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছে৷ বিজেপির মহিলা মোর্চার সভানেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘কংগ্রেস তো ক্রমেই অবলুপ্তির পথে, জীবাশ্মে পরিণত হয়ে গিয়েছে ওঁরা৷’’ আরও একধাপ এগিয়ে ভাটপাড়ার তৃণমূল বিধায়ক অর্জুন সিং বলেছেন, ‘‘কংগ্রেস তো বরাবরই সিপিএমের বি টীম হিসেবে কাজ করেছে৷ তাই বাংলার মানুষ ওদের আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে৷ ওদের আর কোনও অস্তিত্ব নেই৷’’

‘বাংলায় কংগ্রেস দুর্বল’- সাম্প্রতি নির্বাচনী ফলাফল থেকে অকপটে একথা স্বীকার করে নিয়ে রাজ্যের শাসকদলের প্রতি পাল্টা প্রশ্ন রেখেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি৷ অধীরের কথায়, ‘‘আমরা এখন দুর্বল৷ আমাদের নিয়ে এখন ওরা (তৃণমূল) হাসি, ঠাট্টা করবে এটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু ওদের কাছে আমার পাল্টা প্রশ্ন-আপনারা তো ক্ষমতায়, তাহলে ভোটে জিততে কেন এত টাকা খরচ করতে হচ্ছে? কেন সন্ত্রাসের আশ্রয় নিতে হচ্ছে? তাহলে কি মানুষের ভোটে জেতার কনফিডেন্ট নেই, তৃণমূলের?’’ নোয়াপাড়ার সদ্য নির্বাচিত বিধায়ক সুনীল সিং পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘সন্ত্রাসই যদি হবে, তাহলে বিজেপি এত ভোট পেল কি করে?’’

সাম্প্রতিক অতীতে কোচবিহার লোকসভা ও কাঁথি বিধানসভা আসনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল বিজেপি৷ সবংয়ে সিপিএম দ্বিতীয় স্থান দখল করলেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিজেপির ভোট বেড়েছিল ৩০ হাজারের বেশি৷ গেরুয়া শিবিরের ভোট বেড়েছে নোয়াপাড়াতেও৷ যদিও সবকিছু ছাপিয়ে নজিরবিহীনভাবে উলুবেড়িয়া লোকসভার উপ-নির্বাচনে ১লক্ষ ৩৩হাজার ভোট বাড়াতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি৷

রাজ্যের সাম্প্রতিক ভোটের ফলাফল দেখে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টতই বলছেন: কংগ্রেস নয়, এই মুহুর্তে রাজ্যের প্রধান বিরোধীদল বিজেপি৷ প্রসঙ্গত, শেষ বিধানসভা নির্বাচনে ৪৪টি আসনে জয়ী হলেও মানস ভুঁইয়ার মতো একাধিক প্রবীণ কংগ্রেস নেতা জার্সি বদলে তৃণমূলে নাম লেখানোয় সেই সংখ্যা কমে এসে ঠেকেছে তিনের ঘরে৷ এই মুহূর্তে রাজ্যে কংগ্রেসের বিধায়ক সংখ্যা কত? অধীরবাবু বলছেন, ‘’৩৫ কিংবা ৩৬ হবে! না দেখে বলতে পারব না!’’ যা শুনে গেরুয়া শিবিরের এক নেতার সরস কটাক্ষ, ‘‘প্রতিদিনই তো ঘর ভাঙছে৷ ফলে পরিবারের সদস্য ক’জন সেটা মনে রাখাটা সত্যি কঠিন!’’