সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : কথায় বলে আনলাকি থার্টিন। কিন্তু কিছু কিছু ব্যক্তিত্বদের কাছে সেটাই যেন লাকি এবং এক্স ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে অন্যতম অটলবিহারী বাজপেয়ী। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীত্ব মাত্র ১৩ দিনের। দ্বিতীয়বারের দায়িত্ব ১৩ মাসের। ধামাকার শুরু তখন থেকেই। তারপরেই পুরোপুরিভাবে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রাপ্তি ওই বছরেই এবং ভারত বিশ্বের মানচিত্রে অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসাবে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

এভাবেই ১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচনে জেতে বিজেপি। সবচেয়ে বেশি আসন পায়। বাজপেয়ী দশম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। তাঁকে সরকার গড়তে ডাকেন রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মা। তবে অন্য দলগুলি বাজপেয়ীকে সমর্থন না করায় মাত্র ১৩দিনের সরকার ছিল বাজপেয়ীর। এরপরে ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও বিজেপি জেতে। ১৩ মাসের সরকার হয়। সেবারও প্রধানমন্ত্রী হন বাজপেয়ী। ওই বছরেই পোখরানে পরমাণু পরীক্ষা করে ভারত। পরমাণু পরীক্ষার মতো মাতাত্মক কাজে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর উপরে অনেকটাই নির্ভরশীল থাকে বৈদেশিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক। রাজনীতিবিদরা মনে করেন , এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী।

১৯৯৮ সালে একবার দেশের অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে সফরে গিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপায়ী। সেখানে বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালামের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন তিনি। জানতে চেয়েছিলেন, পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করাটা সম্ভব কিনা।

এর চার বছর আগে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ভারতে, কিন্ত সেটা ব্যর্থ হয়েছিল। দুই প্রতিবেশী চিন আর পাকিস্তানের হম্বিতম্বি বন্ধ করতে হলে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হতে হবে ভারতকে, এটাই ছিল ভারতের লক্ষ্য। আবদুল কালামের গ্রিন সিগন্যাল পেতেই আর দেরি করেননি বাজপেয়ী। চার বছর আগের ব্যর্থতা ভুলে আবারও পরমাণু পরীক্ষার সিদ্ধান্তে সহমত প্রকাশ করেন। ১৯৯৮ সালের ১১ আর ১৩ই মে, পাঁচটা নিউক্লিয়ার বোমা উড়ে গেল পোখরান থেকে অনেকটা দূরে, রাজস্থানের ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের দিকে। একদম জনশূন্য একটা জায়গায় গিয়ে পড়লো সেগুলো, ধূ ধূ মরুভূমি ছাড়া কিছুই নেই সেখানে। বিজ্ঞানীরা যেমনটা ধারণা করেছিলেন, তারচেয়ে বেশী গতিতে ছুটে গেল বোমাগুলো।

দিল্লি থেকে সরাসরি মনিটরিং করা হচ্ছিল পুরো অভিযানের খুঁটিনাটি, অটল বিহারী বাজপায়ী যোগাযোগ রাখছিলেন সর্বক্ষণ। পরীক্ষা সফল হবার খবর পেয়েই হেলিকপ্টারে চড়ে বসলেন তিনি, উড়ে এলেন পোখরানে, বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ জানাতে। বিশ বছর আগে এই ‘অপারেশন শক্তি’র মাধ্যমেই ভারত বিশ্বকে জানান দিয়েছিল, কারও হুকুম মেনে নেয়ার জন্যে বসে নেই তারা।

তারপরেও ১৯৯৯ সালে এআইএডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা সরকারের উপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নিলে বাজপেয়ীর সরকার পড়ে যায়। লোকসভায় মাত্র একটিমাত্র ভোটের কারণে আস্থাভোট হেরে যায় বিজেপি। কিন্তু তারা ফিরে এসেছিল ১৯৯৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে। কার্গিল যুদ্ধ ও পোখরানে পরমাণু নিরীক্ষণের পরের এই ভোটে বিজেপি ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩০৩টি আসনে জেতে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাজপেয়ী তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সময়কাল সরকার চালান।