প্রসেনজিৎ চৌধুরী: দু চোখ তার জ্বলছে। প্রবল শক্তি নিয়ে বিকট চিৎকারে রক্ত জল করিয়ে দেয় এই মানব পশু। ভয়ঙ্কর লৌকিক ধারণা-কুসংস্কারে দিব্বি বেঁচে রয়েছে এই কাল্পনিক চরিত্র। কেউ দেখেনি, তবুও মানুষের মনে এক চিরাচরিত ভয় হয়েই নেকড়ে মানব বা মায়া নেকড়ের অস্তিত্ব চলছে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। গ্রিক পুরাণ তো বটেই, বিভিন্ন দেশের উপকথায় চমৎকার এক রহস্যজনক চরিত্র এই মায়া নেকড়ে। তবে ওই গল্পেই তার ঘোরাফেরা।

ভয়াল রূপের এই প্রাণী নেহাতই কাল্পনিক। তবে একে নিয়ে বিভ্রান্তিও ছড়ায়। মায়া নেকড়ে বা নেকড়ে মানবের ইংরাজি নাম Werewolf, মূলত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের লৌকিক গাথায় এর রহস্যজনক গতিবিধি। যে সব দেশে নেকড়ে নামে প্রাণীর অস্তিত্ব থাকে সেখানেই এই মায়া নেকড়ে গল্প তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করে ফেলে দ্রুত। নব্বইয়ের দশক, বলিউডে মুক্তি পেয়েছিল মহেশ ভাট পরিচালিত জুনুন। মুখ্য চরিত্রে রাহুল রায় ও পূজা ভাট। চাঁদনি রাতে এক মানুষের বাঘ হয়ে যাওয়া ও তার জিঘাংসা পরে সেই অভিশপ্ত জীবনের ইতি। সবমিলে সুপারহিট রুদ্ধশ্বাস এক ছবি। ভারতীয় সিনেমায় মায়া নেকড়ে উপকথা ধার করে এই ছবি বিরাট সাফল্য এনে দেয়।

কেমন সেই ভয়ঙ্কর চরিত্র? মনে করুন এক ব্যক্তি। তিনি দিনের আলোয় সাধারণ। কিন্তু আঁধার নামলেই তাঁর দেহে পরিবর্তন হতে থাকে। অনেক অনেক রাতে তিনি মানব খোলস পাল্টে ফেলে এক অতি দানবে পরিণত হন। নেকড়ের মতো মুখ হয়ে যায়, প্রবল শক্তি সঞ্চারিত হয়। তারপর….সেই নেকড়ে মানবের তীব্র চিৎকারে রক্ত হিম হয়ে যায় সবার। আর সেই নেকড়ে মানুষের তখন চাই গরম রক্ত আর একটি মানুষ।

তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে শিকারকে ফালা ফালা করে দেয় সেই মায়া নেকড়ে। আকণ্ঠ রক্ত পাণ করে। রাত বাড়ে আর তার জান্তব দাপাদাপি শুরু হয়ে যায়। একসময় রাত ঢলে পড়ে। চাঁদ মুখ লুকায় দিগন্তের ঘোমটায়। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে নেকড়ে মানব। আবারও তার পরিবর্তন। শেষে একেবারে পূর্ণাঙ্গ মানুষ। ভয়াল রাতের কথা সে নিজেও জানতে পারে না। অনেকে বলেন, মায়া নেকড়ে নিজের ইচ্ছায় রূপ পরিবর্তন করতে পারে। আর সেই হতভাগ্য শিকার, যার রক্তে মুখ ডুবিয়ে রাতের বেলায় পরম আনন্দ পেয়েছিল নেকড়ে মানব, সেই মানুষ হয়ে যায় পরবর্তী মায়া নেকড়ে।

তবে সেই পূর্ণ জ্যোৎস্নায় ভয়ঙ্কর আকার নিতে পারবে। এভাবেই নিজের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছে এই কাল্পনিক দানব। কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও লৌকিক উপকথায় ছড়িয়ে থাকা প্রাণীটা। ইউরোপের গ্রামাঞ্চলে, বন্য এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে এই সব কাহিনি। ঠিক যেমন ছড়িয়ে রক্তচোষা ড্রাকুলা, আগুনমুখী ড্রাগনের গল্প। শুনলে অবাক হবেন, যে দেশ চিন্তায় দর্শনে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করে। যেখানকার দার্শনিকরা জগৎ শ্রেষ্ঠ বলে পরিচিত সেই গ্রিস থেকেই এই মায়া নেকড়ের উৎপত্তি।

তারপর গত ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্সে বেশ জাঁকিয়ে প্রচার হয় এই কাল্পনিক চরিত্রের। শুরু হয়ে যায় আতঙ্ক। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটার পর একটা গল্প বেরিয়ে আসতে থাকে। সেসব নিয়ে রোমাঞ্চ ঘেরা সাহিত্যের জন্ম হতে থাকে। আরও পরে একের পর এক সিনেমা তৈরি হয়েছে মায়া নেকড়ে চরিত্র নিয়ে। অবস্থা এমন গিয়ে দাঁড়ায় যে কিছু মানুষ নিজেদের মায়া নেকড়ে বলে মনে করেন। একাধিকবার এই কাল্পনিক পশুকে নিয়ে সংবাদ মহলে হই হই পড়েছে। কেউ দাবি করেছেন তিনি মায়া নেকড়ে দেখেছেন। কেউ বলেছেন গুলি ছুঁড়ে তাকে জখম করেছি। কোনও প্রমাণ মেলেনি। চাঁদ যেমন তার আলো ছড়িয়ে যায়, তেমনই মায়া নেকড়ে তার ভয় ছড়িয়ে বেঁচে রয়েছে। নেহাতই কুসংস্কার।