সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ওঁরা এক্স ইক্যুয়াল টু প্রেম ধরে নিয়ে অঙ্ক কষতে জানত না। জানত মুণ্ডু ধর থেকে ‘AXE’ করে দিয়ে অর্থাৎ ধর থেকে আলাদা করে প্রেমের অঙ্ক কষতে। ওঁরা কোনও হলদে সবুজ ওরাং ওটাং নয়। ওঁরা আমার আপনার মতোই মানুষ। কিন্তু সাধারণ নয়। ওঁরা অসম নাগাল্যান্ড সীমান্তের দুর্ধষ্য ‘কন্যাক’ উপজাতি।

এখন কন্যাকদের নরমুণ্ড দিয়ে প্রেম নিবেদন বা বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার খবর আসে না। কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়ার বহু পরে ১৯৬৯ সালেও তাদের নরমুণ্ড শিকারের খবর পাওয়া গিয়েছিল। এই কাটা নরমুণ্ড দিয়েই তাঁরা স্বজাতির কোনও তরুণীর হৃদয় হরণ করত। কাটা মাথা দিয়ে ঘর সাজানও হত। এতেই নাকি তাদের ঘরের শোভা বেড়ে যেত।

একটা সময় নাগা প্রত্যেক উপজাতিই মুণ্ডু শিকারই ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ মিশনারি আর সেনাবাহিনীর চেষ্টায় মুণ্ডু শিকারের প্রথা কমতে শুরু করে। পরে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাঙালি নৃবিজ্ঞানী বলেন, “বিলুপ্ত বলা হচ্ছে কারণ ১৯৬৯-এর পর থেকে ৫০ বছর এমন কোনও ঘটনার প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ের আনাচ্ছে কানাচে কোথায় কী হচ্ছে সব সরকারের সর্বক্ষণ নজরে রাখা সম্ভব নয়। হতেও পারে লুকিয়ে চুরিয়ে সেই ভয়ংকর প্রথাকে পাহাড়ের খাঁজেই আটকে রেখেছে।” বিয়ের কনের মন পেতে হলে অন্তত একটা মাথা কেটে আনা ছিল নাগা সমাজের গর্ব।

১৯৪০ সালে ভয়ংকর এই প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করার আগে পর্যন্ত কন্যাকদের মধ্যে লড়াই মানেই প্রতিপক্ষের মুণ্ডু শিকার। প্রতিপক্ষের কোনও যোদ্ধাকে হত্যা করে তার মুণ্ডু কেটে নিয়ে আসতে পারাই তরুণ কন্যাকদের জন্য বীরের মর্যাদা লাভের সুযোগ। ওই নৃবিজ্ঞানীই জানাচ্ছেন, “প্রতিপক্ষের মুণ্ডু কেটে নেওয়া হয়তো অমানবিক, কিন্তু এই নাগা যোদ্ধাদের কাছে এটা ছিল বীরত্বের নিদর্শণ।” মানুষের পাশাপাশি মহিষ, হরিণ, বনগাই, বন্য শূকর আর ধনেশের মাথার খুলি আর হাড়ে সাজানো থাকত সব কন্যাকদের বাড়ির দেওয়ালে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিকারের বীরগাথা যেন লিখে রাখা ছিল এসব হাড়গোড় কঙ্কালে।

বহু বছর ধরে ক্রমাগত শিক্ষা আর আইন কানুনের যৌথ উদ্যোগে এই রীতি বিলুপ্ত হয়েছে বলা চলে। পাশাপাশি বহু কন্যাক এখন শহর বন্দরে হরদম যাতায়াত করে বলে জানা গিয়েছে। সভ্য জগতে থেকে তাদের হিংস্রতা অনেকটাই কেটেছে বলে মনে করা হয়। নরমুণ্ড শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেক কন্যাকই তাঁদের সংগ্রহে থাকা শত্রুদের মাথার খুলিগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলেছে বলে শোনা যায়।