সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ভারতসহ বাংলার বহু গৌরব এবং গ্লানির ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে এই জেলায়। ভারতের পরাধীনতার যাত্রা শুরু এই জেলাতেই। সিরাজের হার এবং পরাধীন ভারত। সেই জেলারই এক প্রান্তে শেষের দিন গুনছে সত্যজিৎ স্মৃতিধন্য এক রাজবাড়ি। ঐতিহ্যরক্ষায় উদ্যোগী ব্যক্তিত্বদের অভিযোগ কোনও প্রশাসনই বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অঙ্গ নিমতিতা রাজবাড়ি সংরক্ষণের কথা ভাবেনি। ফলে ভোট আসে ভোট যায় আরও জরাজীর্ণ অবস্থা হয় রাজবাড়ির।

দুয়ারে হাজির আরও এক লোকসভা নির্বাচন। ভারতবাসী আবারও নতুন কিছুর অপেক্ষা করছে। পরিবর্তনের পথ দেখছে, কিন্তু নিমতিতা রাজবাড়ি যেন আর সেই আশাটা রাখে না। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘জলসাঘর’ ছবির শেষ দৃশ্য। জমিদার বিশ্বম্ভর রায় ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর প্রাসাদপ্রম বাড়ির সামনে। অসুস্থ জমিদারের কীর্তি দেখে ভিত তাঁর ভৃত্যরা। তিনি ভিত নন, তিনি ছুটে চলেছেন তাঁর শেষের দিকে। লাফিয়ে উথল ঘোড়া। টাল সামলাতে না পেরে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন বিশ্বম্ভর। আর উঠলেন না। একই অবস্থা জলসাঘর ছবির শুটিংয়ে সত্যজিৎ রায় ও ছবি বিশ্বাসের স্মৃতিধন্য মুর্শিদাবাদের নিমতিতা রাজবাড়ির। ভাঙতে ভাঙতে সে যেন এখন শেষের দিকেই এগিয়ে যেতে চাইছে।

১৯৫৫ সাল, জমিদারী প্রথা অবলুপ্তি। একই সঙ্গে ঐতিহ্যশালী নিমতিতা রাজবাড়ির শেষের ঘন্টা বেজে যায়। এমন সময়েই সত্যজিৎ রায় যেন সোনার কাঠি হয়ে এসেছিলেন। জলসাঘর সিনেমা শুটিংয়ের জন্য বিভিন্ন রাজবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। বহু রাজবাড়ি দেখেও মনের মতো লোকেশন পাচ্ছিলেন না । অনেক লোকেশন বাতিল করার পরে লালগোলার এক চায়ের দোকানে নিমতিতা জমিদার বাড়ির কথা শোনেন সত্যজিৎ রায়। নিমতিতা রাজবাড়ি পরিদর্শনে এসে তার পছন্দের শুটিং স্পট খুজে পান। তার কথায়, ” আমি যা শুনেছিলাম এ বাড়ি সম্পর্কে, এ বাড়ি তার থেকে ঢের বেশি।”

কলকাতায় ফিরে গিয়ে সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি জলসাঘরের চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন তাঁকে বলেছিলেন “ব্যানার্জি ,আমরা আমাদের শুটিং স্পট খুজে পেয়েছি স্বল্প পরিচিত নিমতিতাতে।” জলসাঘরের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘দেবী’ (১৯৫৯), তিনকন্যা ছবির ‘সমাপ্তি’ (১৯৬০) অংশের শুটিং করেছিলেন এই রাজবাড়িতে। রাজবাড়ির চাকচিক্য ও জাঁকজমক মন কেড়ে নিয়েছিল সিনেমাপ্রেমী মানুষের সেই সময়।

এই রাজবাড়িতেই নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ব্রায়ান ব্রেক তরুণী অপর্ণা সেনকে নিয়ে ‘Monsoon in India’ নামে ফটো স্টোরির শুট করেছিলেন লাইফ ম্যগাজিনের জন্য। এত গর্বের নিদর্শনের বাড়ির সংরক্ষণের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। বাড়ির বর্তমান অবস্থা জরাজীর্ণ যে কোনও সময় বাড়িটার সমস্ত কাঠামোই ভেঙে পড়তে পারে। কঙ্কালসার জীর্ণদশা নিয়ে গঙ্গানদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে ধ্বংসের। মাথার উপরের ছাদ ভেঙে আকাশ উঁকি দিচ্ছে ঘরে। কড়িকাঠের বর্গাগুলো দখল নিয়েছে ঘুণপোকা। দেওয়া থেকে খসে পড়েছে চুনসুরকি বালি। লতা ও আগাছা বংশ বিস্তার শুরু করে দিয়েছে ইঁটের ফাঁকে ফাঁকে। পিঁপড়ে ও কীটপতঙ্গ বাসা বেঁধেছে দেওয়ালের ফাঁকে। রাজবাড়ির অন্তিম লগ্নটা যেন ‘জলসাঘর’ সিনেমার বিশ্বম্ভর রায়ের জমিদারিত্ব ভেঙে পরার মতোই।

১৮৫৫ সালে দুই তুতো ভাই গৌরসুন্দর এবং দ্বারিকানাথ চৌধুরী মুর্শিদাবাদের উত্তর প্রান্তে এক বিস্তৃর্ণ জমি কিনে নিমতিতায় তাঁদের জমিদারীর প্রচলন করেন। জমিদারি সুনাম অর্জন করেছিল তাঁদের হিন্দুস্তানী সঙ্গীত এবং নৃত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং তার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। দ্বারিকানাথের পুত্র মহেন্দ্রনারায়ণ নিমতিতাকে বাংলা কালচারাল ম্যাপে নিয়ে এসেছিলেন।সমসাময়িক স্টেজ থিয়েটারে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। মহেন্দ্রনারায়ণ রাজবাড়ীর পূর্বদিকে হিন্দু থিয়েটার নামের মঞ্চ তৈরি করেন। একসময় দোলের সময় নাটক মঞ্চস্থ হত।

সমসাময়িক বিখ্যাত নাট্যকার এবং অভিনেতারা এখানে তাদের নাটক মঞ্চস্থ করতেন। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ এবং শিশির ভাদুড়ী মত শিল্পীরা এখানে তাদের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। আমন্ত্রিতদের তালিকায় থাকতো তৎকালীন সেরা নাট্যব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে ইংরেজ সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা ,রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা।

বিভিন্ন কারণে এই রাজবাড়িতে পদার্পণ ঘটেছিল কালাজ্বরের ঔষুধ আবিষ্কারক বাঙালি বিজ্ঞানী উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, মুর্শিদাবাদ জেলার তৎকালিন জেলাশাসক তথা শিশু সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়, সাহিত্যিক লীলা মজুমদার, কবি কাজি নজরুল ইসলাম, দাদাঠাকুর প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তিদের। শেষ রানিমা সবিতা চৌধুরী প্রয়াত হয়েছেন বছর ছয়েক আগে। এক মাত্র পরিচারক গোবর্ধন দাসও মারা গিয়েছেন। সবিতাদেবীর দুই ছেলে বর্তমানে থাকেন কলকাতায়। তাঁদের মতোই উদাসীন প্রশাসনও। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একসময় রেলপথও গড়ে উঠছিল। সবই এখন ইতিহাস যা কিছুদিন পরেই হয়তো ফসিল হয়ে যাবে।