প্রতীকী ছবি

বারাকপুর : দশমীর ভোরে নিমতার বিরাটি রেলগেটের সামনে দেবাঞ্জনকে খুন করে দুর্ঘটনার চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছিল, পুলিশি তদন্তে এই উঠে আসছে এমনই বিস্ফোরক তথ্য। ত্রিকোণ প্রেমের জেরেই এই খুন, বলে মনে করছে তদন্তকারী ব্যারাকপুর কমিশনারেটের গোয়েন্দা শাখার পুলিশ। এই ঘটনার দায়ভার নিমতা থানার পাশাপাশি ব্যারাকপুর পুলিশের গোয়েন্দাবিভাগের হাতে গেল বৃহস্পতিবার।

বৃহস্পতিবার বিকেলে দেবাঞ্জনের বান্ধবী তৃষা সরকারকে আটক করে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে নিমতা থানার পুলিশ। সূত্রের খবর এই মামলায় তৃষা, ও তার আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রিন্স সিং সহ মোট ২০ জনের বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের হয়েছে । ৩০২ ধারায় খুনের মামলা রুজু হয়েছে। ত্রিকোণ প্রেমের জেরেই খুন হয় দেবাঞ্জন দাস এবং ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা মাফিক গুলি করে খুন করা হয় তাকে, এব্যাপারে পুলিশ প্রায় নিশ্চিত হলেও গুলিটা কে চালিয়েছিল, সেই ব্যাপারে এখনও ধন্দে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার দেবাঞ্জনের বাবা অরুণ দাস নিমতা থানায় আসেন এবং খুনের মামলা দায়ের করেন। তিনি প্রথম থেকেই দাবি করেছেন, দেবাঞ্জনকে খুন করা হয়েছে এবং তার পিছনে ত্রিকোণ প্রেমের কোনও রহস্য থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশ জানিয়েছিল, গাড়ি দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয়েছে বছর কুড়ির ওই তরুণের। পুলিশ পরিবারের সেই অভিযোগ নিতে চায়নি। তবে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট খুনের সম্ভাবনাকেই জোরালো করছে। আর গোটা ঘটনায় পুলিশেরই চূড়ান্ত গাফিলতি উঠে এসেছে।

আরও পড়ুনসমুদ্রে তলিয়ে মৃত্যু যুবকের, এলাকায় শোকের ছায়া

প্রসঙ্গত, দেবাঞ্জন দাস টেকনো ইন্ডিয়া কলেজের ছাত্র ছিল। অন্যদিকে প্রিন্স বিবিএ নিয়ে পড়াশুনা করছিল। দুজনেই আদিত্য স্কুলের ছাত্র ছিল এবং আদিত্য স্কুলে দুজনের বন্ধুত্ব বেশ ভালো ছিল। সেখান থেকেই তাদের পরিচয় হয় নাগেরবাজার এর একটি স্কুলের ছাত্রী তৃষার সঙ্গে। তৃষার প্রথমে প্রিন্সের এর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক তিন বছর চলে। মাস তিনেক আগে প্রিন্সের সঙ্গে তৃষার বনিবনা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। সেই সুবাদে দেবাঞ্জনের সঙ্গে তৃষার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। দুজনেই একে অপরকে সময় দিতে থাকে। প্রিন্স জানতে পেরে কয়েকবার হুমকিও দেয় দেবাঞ্জনকে।

এদিন দেবাঞ্জনের বাবা অরুণ দাস বলেন, “পুলিশ জানি না কেন প্রথম থেকেই এটাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। আইসিকে খুনের মামলা করতে বলায় তিনি বললেন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না আসা অবধি খুনের অভিযোগ করা যাবে না। তিনি একথাও বললেন আপনার ছেলের অনেক বাজে বাজে ছবি আছে আমার কাছে । এরপর আমরা ফিরে যাই। আমি জানি এটা খুন। প্রিন্স খুনটা করিয়েছে। এর সঙ্গে ওই মেয়েটাও(তৃষা) যুক্ত ছিল। আরো অনেকে জড়িত আছে। প্রিন্সের বাবা দমদমে সাট্টা নিয়ন্ত্রণ করে। দিন পনেরো আগে প্রিন্স বাড়িতে এসে থ্রেট করে গেছিল।”

পুলিশ সূত্রে খবর, বুধবার বিকেলেই দেবাঞ্জনের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে পেয়েছে তারা। সেখানে ওই তরুণের দেহে দু’টি ছিদ্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি তাঁর ঘাড়ের বাম দিকে । অন্যটি, ডান হাতের কনুইয়ের কাছে। গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে শরীরে যে ধরণের আঘাত থাকার কথা, তেমন কোনও কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলেই জানা গিয়েছে পুলিশ সূত্রে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের শীর্ষ এক আধিকারিক বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘দেবাঞ্জনের দেহে ওই ছিদ্র দু’টি গুলি লেগেই হয়েছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। পুরোটা খতিয়ে দেখছি।” তা হলে প্রথমেই কেন তাঁরা দাবি করেছিলেন, গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে! এর কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি ওই পুলিশ আধিকারিক। এমনকি, ঘটনাস্থলে তদন্তে যাওয়া এএসআই গৌতম ঘোষ নিমতা থানার ওসিকে যে প্রাথমিক রিপোর্ট দিয়েছিলেন, সেখানে গুলির কোনও উল্লেখই করেননি তিনি। উপরন্তু তিনি লিখেছিলেন, দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয়েছে। এর পিছনে রহস্যজনক কিছু পাওয়া যায়নি বলেও লিখেছিলেন তিনি।

এদিন ঘটনার তদন্তে নামেন খোদ ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। তিনি দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ যে গাড়ি থেকে দেবাঞ্জনের দেহ পাওয়া যায় সেই গাড়িটিকে সরজমিনে খতিয়ে দেখেন। তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনার তদন্ত করছি। আমাদের কাছে কোন অভিযোগ আসেনি। আমরা থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছি। তদন্ত শেষ না হওয়া অবধি এ বিষয়ে আর কোন মন্তব্য করা ঠিক হবে না। প্রসঙ্গত ব্যারাকপুরের গোয়েন্দা শাখার এসিপি কৌস্তভ আদিত্য চক্রবর্তীও এই ঘটনার তদন্তে নেমেছেন।