তিমিরকান্তি পতি (বাঁকুড়া): বেশ কয়েক বছর পর এবার ২৫তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে দেখা যাবে বাঁকুড়ার একটি স্বল্প দৈর্ঘের ছবি। রামকৃষ্ণ চঁন্দ ও বিপ্লব দাস পরিচালিত ‘দ্য থিজল বল’ নামে ২৪ মিনিট ১২ সেকেণ্ডের এই ছবি আগামী ১২ নভেম্বর বিকেলে শিশির মঞ্চে দেখানো হবে।

এই ছবির অন্যতম পরিচালক বিপ্লব দাস কলকাতা২৪×৭কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, এই ছবির সব শিল্পী, কলাকুশলী যেমন বাঁকুড়ার তেমনি আউটডোর-ইণ্ডোর শ্যুটিং বাঁকুড়াতেই হয়েছে। তিনি আরো জানান, বিশিষ্ট সাহিত্যিক তমাল রায়ের গল্প ‘রিফিউজি’ অবলম্বনে তৈরী হয়েছে ‘দ্য থিজল বল’। মুখ্য ভূমিকায় আছেন বিশিষ্ট অভিনেতা তপন মিত্র।

এই ছবির প্রধান চরিত্র শিবতোষ চ্যাটার্জি একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি বৃদ্ধ। স্ত্রী, পুত্র, বৌমা ও নাতিকে নিয়ে তাঁর সংসার। বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগা, স্মৃতিভ্রংশের শিকার, প্রচণ্ড ভাবপ্রবণ শিবতোষবাবুকে নিয়ে ছবি। ছবির পুরো গল্পটি পরিচালক এখনই খোলসা করতে রাজী নন।

তবে তিনি যা জানালেন, এই ছবির মূল চরিত্র শিবতোষ চ্যাটার্জী বাংলার রেনেসাঁ সংক্রান্ত একটি বই পড়ছেন। এক সকালে প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে শিবতোষ বাবু ঐ বই’তে পড়া রামতনু লাহিড়ি বলে নিজেকে ভাবতে শুরু করেন। আশেপাশের লোকেদের তিনি ডেভিড হেয়ার, রাধানাথ শিকদার, প্যারিচাঁদ মিত্র, হরচন্দ্র ঘোষ ভাবতে লাগলেন, যারা সবাই রেনেসাঁর এক-একজন দিকপাল। ছবি এবং ভাস্কর্য্যের পাশাপাশি রামকিঙ্কর বেইজ বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর প্রতিবাদী সত্ত্বার জন্য। বৈবাহিক জীবনের অন্তঃসারশূন্যতাকে বুঝতে পেরে সকলের হাজারো নিন্দা স্বত্তেও তিনি বেঁচেছিলেন এক অন্যরকম যৌথ জীবনে। সেই রামকিঙ্কর শিবতোষের মননে মাঝে মাঝেই ধরা দেন। শিবতোষ নিজের স্ত্রী বিমলাকে রাধারানী ভেবে ভুল করে বসেন। নিজের পুত্র অভিকে ভাবেন রামকিঙ্করের ভাইপো দিবাকর।

দুশো বছর আগে ঘটে যাওয়া রেনেসাঁ বাঙ্গালির জীবনে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছিল। আধুনিক বাংলার শিক্ষা-শিল্প-চারুকলা-সংস্কৃতি-রাজনীতির বীজটি তখনই বোনা হয়। বেশ কয়েকটি প্রজন্ম ধরে বাঙালি যা বহন করে এনেছে। কিন্তু একুশ শতকের বাংলা হঠাৎই অনেক পালটে গেল। দ্রুতময় জীবন, অবাঙ্গালি ইনফিল্ট্রেশন, জঘন্য উপমহাদেশীয় রাজনীতি, গ্লোবালাইজেশন- এসবের ফলে বাঙালি বৃদ্ধদের অনেকেই আজ যেন অচল। তারা নিজের চেনা পৃথিবীতেই রিফিউজির মতো বাস করছেন।

শিবতোষ এভাবেই বর্তমান জীবন থেকে দূরে সরে গিয়ে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, একাদশ শতকের বৌদ্ধ প্রচারক অতীশ দীপঙ্কর, বাংলার রাজা মহীপাল, তিব্বতের রাজা জ্যাংচুপ এ বিভোর হয়ে থাকেন। এই অদ্ভুত রোগের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে তিনি ধীরে ধীরে পরিচিত মুখগুলোকে চিনতে পারেননা, শারীরিক অনুভব হারিয়ে যায়, কথা হারিয়ে ফেলেন। আর তাকে নিয়ে তার সংসারে নানা রকম টানাপোড়েন চলতে থাকে। এই দ্রুতগামী পৃথিবীতে বৃদ্ধ শিবতোষ শুধু বাংলার নয়, যেন প্রায় প্রতিটি প্রাচীন জনজাতির প্রতিনিধিত্ব করছেন।

ব্ল্যাক মিল্ক প্রোডাকশানের এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন সুদীপ চট্টোপাধ্যায় ও বিপ্লব দাস, সম্পাদনা ও সিনেমাটোগ্রাফি সৌরিম, সঙ্গীত দীপক কুমার। বাঁকুড়াতে বসেও দর্শকদের ভালো ছবি উপহার দেওয়া সম্ভব এর আগেও প্রমাণ করেছেন পরিচালক বিপ্লব দাস। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটির তৈরী স্বল্প দৈর্ঘের ছবি ‘দ্য অরফান লুট’ লণ্ডনের শর্ট ফিল্ম রিভিউ ফেস্টিভাল ২০১৯ ও সিএমএস আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০১৯ স্ক্রিনিংয়ের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এছাড়াও’দ্য অরফ্যন লিউট’ ‘কলম্বিয়া’র “ফেস্টিভ্যাল সিনেমা এনিমেল বোগোটা ২০১৮ দ্যা জুরির বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।