সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : ওদের যত্নেই ভালো রয়েছে চিড়িয়াখানার বাঘ,সিংহ থেকে জিরাফের দল। কেউ বছর কুড়ি আগে এসেছিলেন ওড়িশা থেকে আলিপুর চিড়িয়াখানায়, কেউ বা প্রায় চার দশক আগে এসেছিলেন বিহার থেকে। তারপর কলকাতায় থেকে গিয়েছেন পশুদের ভালোবেসে। স্ত্রী, সন্তান রয়েছে। কিন্তু ভালোবাসাটা কোথাও পশুদের জন্য এক ধাপ বেশি শিউপূজন, রমেশ , সীতারামদের। তারাই এখন চিড়িয়াখানার পশুদের বাবা-মা।

 

আলিপুর চিড়িয়াখানায় জিরাফের ঘর থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে সিংহের খাঁচা। নাগাড়ে হুঙ্কার করছে সিংহ। পশুরাজের এমন রাজকীয় হুঙ্কার শুনলে সাধারণ মানুষের মনে হবে তার খিদে পেয়েছে অথবা কোনও কারণে বিরক্ত। চিড়িয়াখানার পশুদের অন্যতম কেয়ারটেকার রমেশ কিন্তু জানেন, এটা তেমন কিছুই নয়। সিংহ এমনিতেই বেশি হুঙ্কার করে। এটা ওদের স্বভাব। রমেশ এটাও জানেন যে, সিংহ ঘনঘন ডাকলেও বাঘ কিন্তু দিনে তিন বারই ডাকে। জানবেই না কেন ! ১৬ বছরের বেশি হয়ে গেল চিড়িয়াখানায়। কোন পশুর কি অভ্যাস, কেমন মেজাজে রয়েছে তা ভালোমতই জানেন রমেশ। ওদের জন্য যে তার একটা অন্যরকম ভালোবাসা রয়েছে।

চিড়িয়াখানায় গত ৩৯ বছর ধরে রয়েছেন শিউপূজন রাম। তিনি বলেন, “১৯ বছর বয়সে পশু হাসপাতালে জুনিয়র কিপার হিসাবে এসেছিলাম। তারপর সময়ের সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। এখন সমস্ত প্রাণীদের খাঁচার সুপারভাইজারের দায়িত্ব রয়েছে আমার উপরে।” একইসঙ্গে শিউপূজন বলেন, “এই চিড়িয়াখানায় এখনও পর্যন্ত যত জিরাফ এসেছে সবগুলোকে দেখেছি। বর্তমানে ১০ টি জিরাফের সবকটাই সাগর আর উত্তরার পরবর্তী প্রজন্ম।”

শিউপূজন বোঝেন, পশুদের মেজাজ মর্জি। মিলনের সময় পুরুষ পশুরা প্রচন্ড রেগে থাকে। ওর মেয়ে জোড়াটির দিকে যে কেউ গেলেই তার দিকে তেড়ে আসে। তখন ওই পশুকে কয়েকদিন একাই ছেড়ে দেয় শিউপূজন। প্রসবের পর আবার যেকোনও মেয়ে পশুর মেজাজ গরম থাকে। বাচ্চার কাছে গেলেই তার দিকে তেড়ে যাওয়ার প্রবনতা থাকে, তাও জানেন শিউপূজন। তখন মা আর শাবককে বিশেষ নজরে রাখেন শিউপূজন। শিউপূজনের মতে, ঈশ্বরের কৃপায় তাঁদের এখনও পর্যন্ত কোনও বিশেষ খারাপ অভিজ্ঞতা হয়নি।

সীতারাম রাম গত ৩৫ বছর ধরে আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রাণীদের সঙ্গী। কোনও পশুর বাচ্চা হওয়ার সময় বা শরীর খারাপ থাকলে নিজে থেকেই ২৪ ঘন্টা সেখানেই কাটান তিনি। দায়িত্বের পাশাপাশি ওদের জন্য ভালোবাসাও রয়েছে প্রচন্ড। কেউ না বললেও তাই নিজের থেকেই তাদের সঙ্গে থেকে যান সীতারাম। কখনও উদাস কন্ঠে তিনি বলেন, “দেশের বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান রয়েছে। মাঝে মাঝে যাই। এখানে কোয়ার্টারে থাকি।” মজার ছলে বললেন, “এখন এই পশুরাই আমাদের পরিবার হয়ে গিয়েছে। সেখানে বউ ছেলে ভাগ চাইলে কম পড়তে পারে। অশান্তির চেয়ে এই বেশ ভালো আছি।”

শিউপূজন, রমেশ , সীতারাম, এদের পরিচর্যাতেই বেড়ে ওঠে জিরাফ থেকে শুরু করে বাঘ সিংহ। অফিসিয়াল কাজের বাইরেও নিজেদের হাতেই তুলে নিয়েছেন বন্যপ্রাণীদের দেখভালের গুরুদায়িত্ব। কাজে ঝুঁকি অনেকটাই রয়েছে। বন্য জীবদের সঙ্গে দিনের পর দিন জীবনযাপন সহজ কথা নয়। তবে সবটাই ‘টিম ওয়ার্ক’। রয়েছে চিড়িয়াখানার অধিকর্তা, চিকিৎসকদের ভরসা, সবার ভালোবাসা। তবেই না চোখের পলকে খাঁচা বন্দী বন্য ভালোবাসায় কেটেছে সূদীর্ঘ চার দশক।