সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘আপনার বাড়ি কোথায় ?’ ভোটার লিস্টে নাম তোলবার সময় যুবক হয়তো বলেছিলেন ‘মোহনবাগান তাঁবু’। তাই হয়তো ভোটার কার্ডেও তাঁর ঠিকানা লেখা থাকতো ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’। বাড়ি সুদূর ওডিশায়। শুধু সবুজ মেরুনের ফুটবলকে ভালোবেসে কিশোর থেকে প্রায় শেষ জীবন পর্যন্ত কাটিয়ে দিয়েছিলেন ক্লাব তাঁবুতে। তিনি ভাস্কর সেনাপতি, মোহনবাগান মাঠের এক সময়ের মালি।

আরও পড়ুন- বাগানের এক অন্য ফুল-মালি

চেয়েছিলেন মোহনবাগান সংসারে মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যেতে, যাতে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে ঠিকানা লেখা থাকবে “কেয়ার অফ মোহনবাগান”। তা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বাকি জীবনের পুরোটাই সবুজ মেরুন। আসল নাম ছিল ভাস্কর, কিন্তু কখন কিভাবে নামটা ভাসিয়া হয়ে গিয়েছিল ক্লাবের কেউই সে কথা জানেন না। জানে শুধু ভাসিয়া নিজেই।

ওডিশাতে নিজের পরিবার ছিল কিন্তু সব ছেড়ে দিয়ে পরে থাকতেন ক্লাব তাঁবুতে। বাড়ি যেতেই চাইতেন না। ভাসিয়া বলতেন, ‘মোহনবাগানই আমার পরিবার , আমার ঠিকানাও মোহনবাগান।’ ভোটার লিস্টে ভাসিয়ার নামের পাশে ঠিকানার জায়গায় লেখা থাকতো ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’।

১৯৩৭ সাল দাদা কেষ্টর হাত ধরে ওডিশার জাজপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ভাস্কর সেনাপতি। কাজের সন্ধানেই। কাজ পেয়ে গেলন। কাজ জুটল ঐতিহ্যের মোহনবাগান মাঠে মাঠ পরিচর্যার। সেই সময় মোহনবাগানের হেড মালি ছিলেন গঙ্গা। বয়স আঠেরো পেরোয়নি। ভাস্কর নেমে পড়েন কাজে। কাজ জুটলো প্রধান মালি গঙ্গার সহকারি। মাইনে ১৪ টাকা, তারপর তালেগোলে ভাস্কর থেকে ভাসিয়া। সেই ‘ভাসিয়াই’ রয়ে গেলেন মোহনবাগানের পাল তোলা নৌকায়। সেই ত্রিশ দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত মোহনবাগানের হেড মালি ছিলেন ভাস্কর সেনাপতি ওরফে ভাসিয়া।

শুধু মোহনবাগানের সেবা করতে পারবেন না বলে স্টেট ব্যাংক আর ব্রুক বন্ডের দু -দু’টো চাকরি পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিলেন ভাসিয়া। ষাট বছর ধরে কয়েক হাজার ফুটবলারকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন ভাসিয়া, কিন্তু সবার মধ্যে তাঁর অন্যতম প্রিয় ফুটবলার এবং মানুষ ছিলেন গোষ্ঠ পাল। মোহনবাগান কোনো খেলায় হারলেই ভাসিয়া খেতেন না। খালি মনে খালি পেটে থাকতেন। মুখে রুচতোনা কিছু। ক্লাবের হার হজম হত না সহজে। ৭৫-এর শিল্ডে ইস্টবেঙ্গলের কাছে মোহনবাগান পাঁচ গোলে হেরে যাবার পর তিন দিন খাবার স্পর্শ করেননি ভাসিয়া।

১৯৯২ সালে মোহনবাগানের লীগ জয় নিশ্চিত। ইস্টবেঙ্গল তৃতীয়। সেই লীগের শেষ ম্যাচ খেলতে মোহনবাগান নেমেছিল ইস্টার্ন রেলের বিরুদ্ধে। সেইদিনই ভাসিয়ার ক্লাবে শেষ দিন ছিল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দেবার ব্যবস্থা করেন টুটু বসু। মালা পড়ে হাতজোড় করে সমস্ত মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। সেদিন কৃশানু দে’র গোল করে জয় নিশ্চিত করতেই মাঠজুড়ে উৎসবের আবহ। সবুজ গ্যালারি ঢাকা পড়েছিল সবুজ রংয়ের ধোঁয়ায়। জল ছিল শুধু ভাসিয়ার চোখে , সে চোখের জল অবশ্য শুধুই আনন্দের।

তথ্য সূত্র – মনের মাঝে মোহনবাগান