সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে ভোটের ঝাঁপি ভরতে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের প্রধান বুলি হয়ে উঠেছে ‘গণতন্ত্র’। কেউ প্রচার করছে গণতন্ত্র বাঁচানোর স্লোগান দিয়ে , কারও প্রচারে আবার গণতন্ত্রের চৌকিদারি করার লাখ লাখ প্রমাণ। কিন্তু দেশের গনতন্ত্র উদ্ধার করতে বিমান ছিনতাই! এমন ঘটনাও ঘটে। করে দেখিয়েছিলেন সুশীল কৈরালা এবং বিপি কৈরালা।

ঘটনা আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগের। ১০ই জুন ১৯৭৩। স্টেট ব্যাঙ্কের কোনও এক শাখা থেকে নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংকের তিনটে ট্রাঙ্ক ভর্তি ভারতীয় টাকা এসে পৌঁছেছিল বিরাটনগর এয়ারপোর্টে। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ অপেক্ষারত একটি ‘Twin Otter’ বিমানে ওঠানোর পর ১৯ জন যাত্রী ও তিনজন ক্রু মেম্বার নিয়ে ‘Royal Nepal Airlines’ এর বিমানটি উড়ে যায় কাঠমান্ডুর দিকে। এরপরের ঘটনা কোনও বলিউডের সিনেমার চেয়ে কম নয়।

মিনিট পাঁচেক পরেই ওই বিমানের তিন যাত্রী রিভলবার আর গ্রেনেড দেখিয়ে পাইলটকে বাধ্য করে বিহারের ফরবেশগঞ্জের একটি মাঠে বিমান নামাতে। জানা যায় তাদের কাছে প্রায় ৩২ টি পিস্তল এবং গ্রেনেড ছিল। এমন ব্যাপক পরিমান আগ্নেয়স্ত্রের সামনে ভয় পেয়ে বিমান নামে ফাঁকা মাঠে।

সেখানে অপেক্ষায় ছিল তিনটি জীপ। তিনটে টাকার বাক্স আলাদা আলাদা জীপে তুলে নেবার পর বিমানটি ফের রওয়ানা হলো কাঠমান্ডু অভিমুখে। বিমান থেকে ছিনতাইকারিরা লুট করে নিয়ে গেল প্রায় ৩০ লক্ষ ভারতীয় টাকা যা পুরোটাই যাচ্ছিল নেপালে শাসনাধীন রাজার রাজকোষে। সেই টাকা লুট করে গণতন্ত্রের ডাক দিয়েছিলেন বিপি কৈরালা এবং সুশীল কৈরালারা।

নেপালের ইতিহাসে সেটাই ছিল প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা। বিশ্বে বহু কারণে বিমান ছিনতাই হয়েছে কিন্ত দেশে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য ছিনতাইয়ের ঘটনা বেনজির। রাজতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি পেতে এই ছিনতাইয়ের নেপথ্যে ছিলেন দিল্লিতে নির্বাসিত নেপাল কংগ্রেসের সভাপতি বিপি কৈরালা। পুরো অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন সুশীল কৈরালা যিনি সেদিন ফরবেশগঞ্জে জীপে বসে রেডিও টেলিফোনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি পরিচালনা করছিলেন।

ঘটনায় অংশগ্রহণকারী বসন্ত ভট্টরাই, দুর্গা সুবেদি, নগেন্দ্র প্রসাদ ধুঙ্গেল, গিরিজা প্রসাদ কৈরালা, চক্র প্রসাদ বাসতোলা সহ আরও অনেকে ছিলেন। CBI এর তদন্তে ধরা পড়ে অনেককেই তিহার জেলে কারাবাস হয়। ঘটনার পিছনে আরও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। নেপাল কংগ্রেসের সম্পাদক সুশীল কৈরালার দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে সেদেশে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। গণভোটে ১৯৫৯ সালে রাজাকে হারিয়ে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বিপি কৈরালা।

কিন্তু নেপালের তৎকালীন রাজা মহেন্দ্র সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে এই সরকারকে বরখাস্ত করেন এবং সুশীল কৈরালাসহ নেপাল কংগ্রেসের প্রায় প্রত্যেক নেতাকেই ১৬ বছর ভারতে নির্বাসনে থাকতে হয়েছিল। যার ফল ছিল ওই বিমান হাইজ্যাক।

নেপালে রাজতন্ত্রের অধীনে ছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ধীরে ধীরে পরিবারিক কলহ এবং অর্থনীতিতে ভাঙন ধরে। ওই বছরেই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। ২০১৪ সালের ফেব্রয়ারী মাসে সুশীল কৈরালা নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন। বিবিসি তাদের সমীক্ষায় তাঁকে বিশ্বের দরিদ্রতম রাষ্ট্রপ্রধান আখ্যা দিয়েছিল। একসময় নেপাল হিন্দুরাষ্ট্র ছিল বর্তমানে সেই তকমাও ছেঁটে ফেলতে সক্ষম হয়েছে নেপালের গণতন্ত্র।