সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: লালু , ভুলু , কালি , ভিকি নাম ধরে বার দুয়েক হাঁক দিলেন তিনি। ওরা ছুটে এল। ঘিরে ধরল। পায়ের তলায় লুটিয়ে ভরিয়ে দিল ভালোবাসায়। তিনিও ফেরালেন না। স্নেহের সঙ্গে ভাত , মাংস থালায় সাজিয়ে খেতে দিলেন ওদের। রত্না মুখোপাধ্যায় বললেন, “জানেন, ওরা না ভালোবাসার কাঙাল, ওদের একটু দিন। ওরা আপনাকে অনেকটা ফিরিয়ে দেবে। মানুষের থেকে অনেক ভালো আমার ভুলু,ভিকিরা”

এক বছর, দু’বছর নয়, গত সাত বছর ধরে রাজপুর সোনারপুর পৌরসভার নবীন পল্লীর সমস্ত পথ সারমেয়দের অন্নদাতা ‘মা’ রত্না দেবী। গৃহশিক্ষক হিসাবে শিক্ষাদান করে যে অর্থ উপার্জন করেন তার পুরোটাই খরচ করেন তাঁর সন্তানদের লালন পালনের জন্য। সামাজিক, পারিবারিক থেকে শারীরিক বহু বাধা এসেছে সামনে। কিন্তু সমস্ত সমস্যাকেই সরিয়ে ওদের দুবেলা অন্ন জুগিয়ে যান রত্না মুখোপাধ্যায়। এমনই তাঁর ভালোবাসা।

 

রত্নাদেবী বলেন, “আমার এটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আগেও বলেছে এখনও বহুজন আমার এই কাজের বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু আমি এসব নিয়ে ভাবি না। ভাবি আমি না থাকলে ওদের কে খাবার যোগাবে? নিজের মেয়ের পাশাপাশি ওরাও আমার সন্তান, আমি ওদের মা।” দু’বেলা পাঁচ কিলো করে সিদ্ধ চালের ভাত সঙ্গে মাংস খাইয়ে ওদের চেহারায় পরিবর্তন এনে দিয়েছেন।

এদিকে ওদের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে গিয়ে নিজের নাওয়া খাওয়া হয়ে ওঠে না ঠিকভাবে। শরীর মানেনি। চিন্তা দ্বিগুন হয়েছিল নিজের অসুস্থতার কথা ভেবে নয়। চিন্তা তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রায় ৮০ জন সন্তানের খাবার কে যোগাবে?

রত্না মুখোপাধ্যায় বলেন, “প্রথমে আমার বাড়ির কাছের কয়েকটা কুকুরকে খেতে দিতাম। ধীরে ধীরে সংখ্যাটা বেড়ে গিয়েছে। সেটা এখন ৭৮। আমার ভালোই লাগে। পরিশ্রম প্রচুর। প্রত্যেক দিন বাজার করে নিয়ে এসে রান্না করে তারপর ঘুরে ঘুরে খাবার দেওয়া। পুরোটাই আমি করি। আমার মেয়ে , আমার ছাত্ররাও আমাকে হাতে হাতে সাহায্য করে।”

দুপুরবেলা হলেই ব্যাগ ভরতি থরে থরে খাবার সাজিয়ে বেড়িয়ে পরেন রত্নাদেবী। তারপর ঘণ্টা দুই আড়াই ধরে চলে এই খাওয়ানোর পর্ব। বাড়ি ফিরে পড়িয়ে নিয়ে রাতের দিকে আরও এক প্রস্থ ওদের খাবার আয়োজন। এভাবেই গত বছর সাতেক কাজ করছেন তিনি।

রত্না দেবীর কথায়, “পাড়ার অনেকে বাধা দিয়েছে। আমার স্বামীও খুব একটা কুকুর পছন্দ করতেন না। এখন ওঁর অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। ওদের সুখ থেকে অসুখ সব দায়িত্ব আমার।”

এর জন্য নিজের ভাঁড়ার শেষ হওয়ার জোগাড়। তাতেও থামতে চান না তিনি। চাইছেন কিছু সাহায্য। কেউ পাশে দাঁড়ালে আরও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কাজ করবেন বলে জানাচ্ছেন রত্নাদেবী।

কুকুর মেরে ‘হিরো’ বনে যাওয়া অসামাজিকদের কাছে চান বার্তা পৌঁছে দিতে। বলতে চান, ‘ওরা ভালোবাসার কাঙাল। একটু দাও। এত্তটা পাবে।’

ছবি- মিতুল দাস