সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় হাঁটুর বয়সী ছিলেন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁদের দুজনের যখনই সাক্ষাৎ হয়েছে বলাইচাঁদকে অবাক করেছেন বিশ্বকবি। কখনও তাঁর খাদ্য তালিকায় কখনও তাঁর রসবোধের মাধ্যমে। প্রতি ক্ষেত্রেই সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের মুখখানি বড় করে ‘হাঁ’ হওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকত না।

প্রথম ঘটনাটি ১৯৩৯ সালের। নভেম্বর মাস। সেই সময়ে নভেম্বর মাসের শীত আর এখনকার নভেম্বরের শীতের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। এখনই শীতকালে বীরভূম জেলার তাপমাত্রা নেমে যায় দশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সেই সময় আরও বেশি ঠাণ্ডা হতেই পারে। ভোর রাত্রে শান্তিনিকেতনে পৌঁছন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। সোজা গিয়ে ওঠেন শান্তিনিকেতনের ‘শ্যামলী’তে। ঘরে প্রবেশ করেছেন। ওই মারাত্মক ঠাণ্ডাতেই রবীন্দ্রনাথ চান করে নিয়েছেন। সেটাই নাকি তাঁর অভ্যাস ছিল। এরপরে যা ঘটল তা চক্ষু ছানাবড়া করে দিয়েছিল বনফুলের।

৭৮ বছরের বৃদ্ধ মানুষটি একের পর এক যে খাবার দাবার খেলেন তা চমকে দেওয়ার মতো। সাধারণ মানুষ খেলে ব্রেক ফেল করার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু বিশ্বকবি তো সাধারণের তালিকার বাইরে। কাজেই তাঁর ব্রেক একদম কন্ট্রোলেই ছিল। কি খেলেন তিনি? মুগের ডাল, ছোলা-বাদাম-পেস্তা ভেজানো, গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে ডিমসেদ্ধ, মাখন দেওয়া রুটি এবং ক্রীম। চমকের আরও বাকি ছিল। এরপর রবীন্দ্রনাথ মধু মাখিয়ে দু’ পিস পাঁউরুটি খেলেন। মুখটা বেশি মিষ্টি হয়ে গিয়েছিল সম্ভবত।

রবীন্দ্রনাথ একটা বড় শিশি বার করে মুড়ি ঢেলে মুড়ি খেলেন। এরপর দুধ ভর্তি করে এক কাপ কফি। নিজে খেলেন চিনি দিয়ে। অবশ্য এরই মাঝে আর বনফুলের জন্যও হাজির হয়েছিল লুচি, আলুর ছেঁচকি, সিঙারা, কচুরি, কেক, বিস্কুট, আপেল, কলা। কফিও দেওয়া হয়েছিল। বলাইচাঁদ খাচ্ছেন।কিন্তু তিনি খাচ্ছেন কম দেখছেন বেশি। চারমূর্তি সিনেমায় টেনিদার চরিত্রে চিন্ময় মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত খাওয়া দাওয়ার দৃশ্যের সঙ্গে রবি ঠাকুরের এই খাওয়ার তুলনা করলেও কিছু ভুল হবে না।

এরপর বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় দেখলেন শ্যামলীর কোনও এক ভৃত্য খেজুরের রস নিয়ে আসছে। রবীন্দ্রনাথ তাকে জানালা দিয়েই বললেন, “এখন নিয়ে এলে? আমার কফি খাওয়া যে হয়ে গেল।” খেতে খেতেই বনফুলকেও খেজুরের রস ‘অফার’ করেছিলেন। বনফুল খেলেন। এরপর রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন ছিল, “এখন দু’এক চুমুক চা খেয়ে নিলে কেমন হয়? তুমি তো কিছুই খাওনি দেখছি। তুমি এক কাপ নাও- আমাকেও এক কাপ দাও। দুটো কচুরিও দিও আমাকে।” বলাই? না তিনি এবারে হয়তো আর কিছু বলতে পারেননি। এটা যে বলা যেতেই পারে, তা বলাই বাহুল্য।

দ্বিতীয় ঘটনা একটি সভার। সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বকবি। বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের বক্তৃতা শুনে প্রশংসা করলেন প্রত্যেকে। এক রবীন্দ্রনাথ বাদ দিয়ে। তিনি নির্বিকার। সবাই যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁর এমন প্রতিক্রিয়ার কারন তিনি কিছুক্ষন চুপ থেকে তারপর অল্প হেসে বলেন, “বলাই তো ভালো বক্তৃতা দেবে। ওর নাম যে বলাই, বলাই তো ওর কাজ।”

তথ্য সুত্রের বিশেষ সৌজন্য : Suraj Pal এবং Sourav Chakraborty