স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: বর্তমান রাজ্য সরকার রাজ্যের লোকশিল্পীদের সম্মান জানাতে এবং তাঁদের আর্থিক দূরবস্থা ঘোচাতে দেওয়া হয়েছিল লোকশিল্পীদের সচিত্র পরিচয় পত্র, সাম্মানিক ভাতাও। কিন্তু সেই সচিত্র পরিচয় পত্রের নকল করে একশ্রেণীর লোকশিল্পী অসাধু কাজ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়ার পর রীতিমত নড়েচড়ে বসল রাজ্য তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর। এখনও পর্যন্ত দুই ২৪পরগণা জেলা থেকে এই ধরণের অভিযোগ আসায় গোটা রাজ্য জুড়েই লোকশিল্পীদের পরিচয়পত্রের খোলনলচে বদলে ফেলার কাজ শুরু করে দিল তথ্য দপ্তর।

নকল লোকশিল্পীর পরিচয়পত্র তৈরী করে অসাধু উপায়ে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া আটকাতে অনলাইন পদ্ধতিতে তৈরী নতুন পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু করল তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর। সোমবার পূর্ব বর্ধমান জেলার ১৩ জন শিল্পীর হাতে এই পরিচয়পত্র তুলে দেন জেলা সভাধিপতি এবং জেলাশাসক। এদিন বর্ধমানের সংস্কৃতি লোকমঞ্চে পূর্ব বর্ধমান জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক কুশল চক্রবর্তী জানান, বিভিন্ন জেলায় কিছু মানুষ লোকশিল্পীদের পরিচয়পত্র নকল করে অসাধু উপায়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। এই জেলায় এই ধরনের কোনও অভিযোগ না পাওয়া গেলেও উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ক্ষেত্রে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর।

লোকশিল্পীদের পরিচয়পত্র এতদিন স্থানীয় স্তরেই তৈরী হত। দেড় মাস আগে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এই পদ্ধতির পরিবর্তন করেছে। এখন অনলাইন পদ্ধতিতে এই পরিচয়পত্র তৈরী হচ্ছে। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে অনলাইনে তৈরী কার্ড প্রিন্ট করে সেই কার্ড শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কুশল চক্রবর্তী জানান, বর্ধমান জেলায় নথিভুক্ত লোকশিল্পীর সংখ্যা ছিল তিনহাজার সাতশো জন। এই বছরে নতুন করে আরও ৯০২৭ জন লোকশিল্পী নথিভুক্ত হয়েছেন। প্রথমে এই ৯০২৭ জনকে নতুন পদ্ধতিতে তৈরী পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। পরে পুরনো ৩৭০০ জনকেও এই নতুন পদ্ধতিতে তৈরী পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। তিনি জানান, আগামী তিনমাসের মধ্যেই মোট ১২,৭২৭ জন শিল্পী এই নতুন পরিচয়পত্র পেয়ে যাবেন। পদ্ধতিটি একদম নতুন হওয়ায় পরিচয়পত্র তৈরী করে শিল্পীদের কাছে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এদিন নতুন নথিভুক্ত শিল্পীদের মধ্যে থেকে ১০০০ জন লোকশিল্পীকে বর্ধমান সংস্কৃতি লোকমঞ্চে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। প্রশিক্ষক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, শিল্পী ফকির সাধন দরবেশ, লেবু হেমব্রম, সুশান্ত ষোষ এবং দীনবন্ধু সিং।

রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরবেন, তাঁরা কি ধরণের পোষাক পড়বেন তা জানানো হয় এই প্রশিক্ষণ শিবিরে। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, পূর্ব বর্ধমান জেলাপরিষদের সভাধিপতি দেবু টুডু, জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব, অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) রত্নেশ্বর রায় প্রমুখ।

সভাধিপতি জানান, এই বছরে ৯০২৭ জন লোকশিল্পী নতুন ভাবে নথিভুক্ত হওয়ায় জেলায় লোকশিল্পীর সংখ্যা হয়ে দাঁড়াল ১২,৭২৭ জন। এখনও অনেক মানুষ বাকি আছেন। তাদের যুক্ত করলে ভাল হয়। তাদেরকে অবশ্যই যুক্ত করাও হবে। শুধু এই জেলাই নয় গোটা রাজ্যে কোনও লোকশিল্পীই বাদ পড়বেন না এই তালিকা থেকে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া বাকি কোনও রাজ্যই লোকশিল্পীদের মর্যাদা দেয়না বলে জানান সভাধিপতি। তিনি বলেন, এরাজ্যেও প্রত্যেক সম্প্রদায় তাঁদের সংস্কৃতি ভুলতে বসেছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে বর্তমান রাজ্য সরকার লোকশিল্পীদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কাজ করে চলেছেন।

জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেন, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যই সমাজে লোকশিল্পীদের গুরুত্ব বুঝেছে। রাজ্য সরকার লোকশিল্পকে কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় সেই বিষয়টি যেমন দেখছে, তেমনি মানুষকে সচেতন করতেও লোকশিল্পীদের কাজে লাগানো হচ্ছে। জেলাশাসক জানান, গ্রামের মানুষকে বোঝাতে লোকশিল্পীদের গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের থেকেও তাদের গুরত্ব বেশি। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামে একমাত্র লোকশিল্পীরাই পৌঁছাতে পারেন। প্রশিক্ষক ফকির সাধন দরবেশ বলেন, যারা এই কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হয়েছেন তারা নিজে সেইসব সচেতনতার বিষয় মেনে চলছেন কি? সেটা পালন করতে না পারলে সেকথা মানুষ মানবেনা।

জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক কুশল চক্রবর্তী জানান, নতুন করে আরও প্রায় ৭০০০ লোকশিল্পী নথিভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য ঠিকমত জমা না দেওয়ায় অনেক লোকশিল্পী তাঁদের মাসিক আর্থিক সহায়তার টাকা পাচ্ছেন না। অনেকে জনধন যোজনার অ্যাকাউন্ট নম্বর জমা দিয়েছেন। সেই অ্যাকাউন্টে অনেকে শিল্পীর ৫০ হাজার অথবা তার বেশি টাকা আছে, এই সমস্ত অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে না। টাকা ছাড়ার পর অনেক ব্যাঙ্ক সেই নির্দিষ্ট অ্যাকান্টে জমা করতে অনেক দেরি করে দিচ্ছে। কাটোয়া থেকে আসা এক লোকশিল্পী প্রশ্ন করেন, গ্রামে কোনও প্রকল্পের প্রচার করতে গেলে সেখানকার বাসিন্দারা বলেন, রাজনৈতিক প্রচার করতে এসেছেন। এটা থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে তা নিয়ে ভাবার দরকার পড়েছে। সরকারী প্রকল্পের প্রচারের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচার মিলেমিশে যাওয়াতেই সমস্যা দেখা দিচ্ছে লোকশিল্পীদের সামনে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ