সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , কলকাতা : তাঁকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল। একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে বিজেপি তৃণমূল। সপ্তম দফা ভোটের আগে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মূর্তি ভাঙাই ছিল সবথেকে বড় ঘটনা। কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে ঘটে যায় ভয়ঙ্কর ঘটনা। ঘটনার জেরে ২৪ ঘণ্টা আগে সব দলের প্রচারই বন্ধ করে দেয় নির্বাচন কমিশন। প্রচার বন্ধ হলেও নেতাদের একে অপরের উপর এই প্রসঙ্গ নিয়ে অভিযোগ , পালটা অভিযোগ চলছে। এত অশান্তির মাঝে শান্ত ভাবে ভোট প্রক্রিয়া হল আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয়, যার প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

শিক্ষার উন্নতির জন্য কলকাতায় বহু স্কুল তৈরি করে দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। এর মধ্যেই অন্যতম আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয় যা প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৫৯ সালে। মূর্তি কাণ্ড যখন ভোটের অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে তখন বিদ্যাসাগরের হাতে তৈরি হওয়া স্কুল দেখল শান্তিতে ভোট প্রয়োগের ছবি। কুমকুম হাজরা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েই বললেন , “এখানে ভোট দিতে এসে কোনও সমস্যা হয়নি। আজও হয়নি। ওনার মূর্তি যারা ভাঙে তাদের শিক্ষার অভাব আছে, আমাদের এই এলাকার মানুষের সেই শিক্ষা রয়েছে বলে আমি মনে করি।” স্বরূপ সামন্ত নামে এক ভোটার বলেন , “চিরকাল এখানে শান্তিতেই ভোট দিয়ে আসছি। আজও তেমন ভাবেই ভোট হচ্ছে। রাজনীতির কালো অধ্যায়ের ছায়া এই ঐতিহাসিক স্কুলের থেকে অনেক দূরে।” অহন চ্যাটার্জির এবার এটাই প্রথম ভোট।

সে জানাল , “আমি প্রথমবার ভোট দিচ্ছি এটা নিয়েই বেশ এক্সাইটেড। কোথায় কি হচ্ছে জানি না আমাদের এখানে কোনওদিন ভোট নিয়ে ঝামেলা হয়েছে হয়েছে বলে শুনিনি। বিদ্যাসাগরের ওই ঘটনা নিয়ে নতুন করে কি বলব , এটা নোংরামি ছাড়া কিছু নয়। আমার মনে হয় এসব নিয়ে ভাবার চেয়ে নিজের ভোট নিজের এলাকা এবং নিজের চাহিদাগুলো মাথায় রেখে বোতাম চাপা উচিৎ।”

এক পুলিশ কর্তা দাঁড়িয়েছিলেন ওই ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সামনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অফিসার বলেন , “সকালে ভোট একটু স্লো হচ্ছিল। আসলে স্কুলের সামনের জায়গা বেশ সরু। তাই সকালের দিকে লাইন মুভ করতে অসুবিধা হয়েছে। বেলা থেকে লাইন ভালোই এগোচ্ছে।”

প্রসঙ্গত , গত মঙ্গলবার কলকাতায় অমিত শাহের রোড শো’তে ঘটে মূর্তি কাণ্ড। বিদ্যাসাগর কলেজ ক্যাম্পাসে হামলা চালানো অভিযোগ ওঠে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। বাইরে থেকে পাথর, ইট ছোড়া হয়। বাইকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরেই কলেজের বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে ভাঙা হয় বিদ্যাসাগরের ঐতিহ্যবাহী মূর্তি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অন্যতম কৃতিত্ব শিক্ষা সংস্কার। হিন্দুশাস্ত্রবিদ হয়েও ধর্মকে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নির্বাসিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি বিদ্যাসাগর মহাশয়।

রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির প্রবর্তন ছাড়াও বেদান্তকে ভ্রান্তদর্শন বলে ব্যাখ্যা করে তার পরিবর্তে দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে তাঁর মতদান, এক উদার ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাদর্শের সূচনা ঘটায়। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার তিনি ছিলেন একান্ত পক্ষপাতী। এজন্য বাংলা বর্ণমালাকে সংস্কৃত ব্যাকরণের অযৌক্তিক নিয়মজাল থেকে মুক্ত করে নির্মেদ ও আধুনিক করে তোলাকে তিনি বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন। বর্ণপরিচয় গ্রন্থে তাঁর লিপিসংস্কারই পরবর্তীকালে বাংলা লিপির আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। আজ পর্যন্ত এই লিপিই বাংলায় প্রচলিত। অন্যদিকে বিভিন্ন উচ্চমানের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেও তিনি শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতিতে বিশেষ সহায়তা করেন। এই সব পাঠ্যপুস্তকগুলিও তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাচেতনার উজ্জ্বল নিদর্শন।

এছাড়াও গ্রামে গ্রামে স্কুল স্থাপন, দরিদ্র ছাত্রদের জন্য অবৈতনিক বিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষার্থে কলেজ স্থাপন করে শুধুমাত্র কলকাতার উচ্চবিত্ত সমাজেই নয়, সমগ্র বাংলার ঘরে ঘরে সাক্ষরতার আলো জ্বালানোর ব্রত নেন তিনি। মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে তিনি দেখিয়ে দেন শুধুমাত্র ভারতীয় অধ্যাপকদের সাহায্যেই ইংরেজের তুল্য উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠন সম্ভব কিনা। বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশ ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার প্রবর্তনেও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। তাঁর রচনায়, কার্যে নানাভাবে বিজ্ঞান প্রীতির নিদর্শন রেখেছেন তিনি। এমনকি উনিশ শতকের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও তত্ত্ব সম্পর্কেও নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন বলেও জানা যায়।