রানা দাস ও সৌমেন শীল, বেঙ্গালুরু: তিনি আর ইহলোকে নেই। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসেই তাঁকে খুন করা হয়েছিল। কিন্তু ৭০ বছর পরে ২০১৮ সালেও তাঁকে দেখা যাচ্ছে। সশরীরে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। একই ধারায় খুঁজে চলেছেন দেশের স্বাধীনতা। তাঁর উপরেই যেন রয়েছে গুরু দায়িত্ব। কারণ তিনিই যে জাতির জনক।

বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় আলোচ্য ব্যক্তি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তথা মহাত্মা গান্ধী। সাত দশক পার করে জীবন ধারায় বিশেষ কোনও বদল হয়নি। একইরকমভাবে ধুতি পরে লাঠি হাতেই রয়েছেন। উদ্দেশ্য এক থাকলেও বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক রঙ। তিনি এখন প্রচার করেন ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে। তুলে ধরেন নরেন্দ্র মোদীকে।

বলাই বাহুল্য যে উল্লিখিত ব্যক্তি আসলে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী নন। তবে শারীরিক গঠন এবং বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখলে বোঝার উপায় নেই যে ইনি গান্ধীজি নন। মনে হতেই পারে যে তিনি মহাত্মা গান্ধীর কোনও বংশধর। কিন্তু সেটাও নয়। ছবিতে দেখতে পাওয়া লোকটি হলেন অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা। গোয়ার বাসিন্দা এই ব্যক্তি ছিলেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। স্ত্রী-কন্যা সহ সুখের সংসার ছিল। কিন্তু সেই সব ছেড়ে এখন তিনি দেশের সেবায় তথা স্বাধীনতার কাজে মন দিয়েছেন সেই বাপুর পথেই। তবে তাঁকে দেখা যায় না কোনও কংগ্রেস দফতরে বা নেতাদের সঙ্গে। বিরোধী বিজেপি-র সঙ্গেই তিনি স্বছন্দ্য।

হঠাৎ করে মহাত্মা গান্ধীর উপরে এতটা প্রভাবিত হলেন কেন অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা? চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকার কারণেই কি বাপুর বাণী ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি? জবাবে অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা জানিয়েছেন যে চেহারার সাদৃশ্য অবশ্যই একটা বড় বিষয়। তবে গান্ধীজির মতাদর্শ পড়েও তিনি বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েই এই পথে এসেছেন। তাঁর কথায়, “স্বাধীনতার সময়ে মহাত্মা গান্ধী যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশ তেমন হয়নি। লেখাপড়া জেনেও যুব সমাজ চাকরি পাচ্ছে না দুর্নীতির কারণে।” এই বিষয়ে শিয়ালদহ স্টেশনের এক যুবকের উদাহরণ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, “কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে এক স্নাতক যুবককে দেখলাম জুতো সেলাই করছে। ঘুষের টাকা না দিতে পারায় নাকি তাঁর চাকরি হয়নি।” এই সকল প্রতিকূলতা দূর করতেই তিনি দেশ জুড়ে বাপুর বাণী প্রচার করে চলেছেন বলে জানালেন অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা।

সমাজ বদলের জন্য একটা রাজনৈতিক ছত্রছায়া দরকার তা বুঝতে পেরেছেন অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা। সেই কারণেই মিশেছেন পদ্ম শিবিরে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী তো কংগ্রেস নেতা ছিলেন! “যে কংগ্রেস সঠিকভাবে গান্ধীজির হত্যা রহস্যের কিনারা করতে পারে না তাদের উপর কী ভরসা করব?” অভিযোগের সুরে বললেন বাপুজির প্রতিবিম্ব। রাজনীতিবিদদের তালিকায় এগিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। বিশেষ করে মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প তাঁর খুব নজর কেড়েছে। এই বিষয়ে তিনি বলেছেন, “দেশের মাটিতে কাজের সুযোগ বাড়লে উৎপাদন খরচ কম হবে। আর দেশের যুব সমাজের চাকরি হবে। এতে দেশের সার্বিক উন্নতি হচ্ছে।”

বাপুজি হিসেবে ২০১৬ সাল থেকে যাত্রা শুরু করেছেন অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা। ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গত ৭০ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন ছোট দেশের উন্নতির তালিকা তুলে ধরেন দেশের জনসাধারণের কাছে। যাতে দেশের একদম সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন জাপান বা জার্মানির মত ছোট দেশ উন্নতি করতে পারলে ভারতেরও প্রভূত উন্নতি হওয়া সম্ভব। তবে দেশের সর্বত্র গিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন না তিনি। “সব জায়গার ভাষা বুঝি না বলে অনেক সমস্যা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে যেতে পারি না,” আক্ষেপের সঙ্গে বললেন অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা।

বাপুজির মতোই দেশ এবং দেশবাসীর সেবার নিয়ে থাকতে চান গোয়ার বাসিন্দা অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে চেহারায় সাদৃশ্য থাকায় সিনেমায় অভিনয় করার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন অবলীলায়। চলতি বছরেই দেশ জুড়ে শুরু হয়ে যাবে মহাত্মা গান্ধীর সার্ধ শতবর্ষ উদযাপন। সেই উপলক্ষে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পর্দায় মুখ দেখাতে আগ্রহী নন বলে সেই সকল প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন জাতির জনকের প্রতিরূপ অগাস্টাইন ডি অ্যালমাইরা।