সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক। রবীন্দ্র সমসাময়িক। বিশ্বকবি তাঁর গুনমুগ্ধ পাঠকও ছিলেন। পাত্তা পাননি। কিছুটা নিজের দোষে, অনেকটা অভাবের ফলে। অনেকে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। একের পর এক বই লিখিয়ে নিয়ে গিয়ে ছাপিয়ে দিতেন বেনামে। কিন্তু বিশ্বকবি ? না , তিনি তো বিশ্বকবি। উলটে তাঁর কবিতার প্রশংসা করে লিখেছিলেন একের পর এক চিঠি। হাওড়ার গর্ব নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্যের পাওনা সম্মান হয়তো এইটুকুই। অথচ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন অনেক কিছুর। হল কই?

সেই চিঠি কেমন ছিল? ভারতী মাসিক পত্রিকায় ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘ধরাসুন্দরী’ কবিতা। পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী। কবিতাটি পড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কবিকে লিখলেন , ” আপনার কবিতাটি আমার বিশেষ ভালো লাগিয়াছে “। এরপর আরও কয়েকটা কবিতা তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন । কবিগুরু পত্র মারফত জানিয়েছেনঃ ( ৮ই এপ্রিল ১৮৮৫ ), ‘নমস্কার পূর্বক নিবেদন —- ‘আপনার কবিতা সুন্দর হইয়াছে। ভারতীতে পাঠাইয়া দিব । আমার যে কয়খানি গ্রন্থ আমার কাছে আছে আমি আপনাকে দিতে পারি। ভারতী সকল সংখ্যা নাই – অসম্পূর্ণ । সময়াভাবে তাড়াতাড়ি লিখিলাম। মাপ করিবেন। স্বাক্ষরঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’

শুধু রবীন্দ্রনাথ নয় তাঁর গুনমুগ্ধ ছিলেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কবি তখন কলকাতায় কবি রাজকৃষ্ণ রায়ের পত্রিকার অফিসে চাকরি করেন । সোমপ্রকাশ , ভারতীর পর প্রচার মাসিক পত্রে তাঁর কবিতা বের হতে থাকে । এই পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড় জামাই রাখালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় । নবকৃষ্ণ পত্রিকাটির বিভিন্ন লেখার মধ্যে বহু ব্যাকরণগত ভুল বের করেছিলেন। ব্যাপারটি বঙ্কিমচন্দ্র জানতে পেরে নবকৃষ্ণের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং এতটাই সন্তুষ্ট হন যে তাঁর ওপর গ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্ব দেন । এমনকি নিজের বাড়িতে সমাদরে রেখে তাঁর নাতি, নাতনীদের পড়ানোর ভারও দিয়েছিলেন।

কবির পরিবার সূত্রে কবি বঞ্চনার বহু ঘটনা জানা যায়। কলেজ স্ট্রিটের ‘স্কুল লাইব্রেরী’ কবিকে দিয়ে ব্যাকরণ সহ বহু বই লিখিয়ে নিত। বইয়ে ইচ্ছেমত লেখকের নাম বসিয়ে বোর্ডের অনুমোদন বের করে ছাপা হত। তৎকালীন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল নবকৃষ্ণের। তিনিও একই কাণ্ড করেছিলেন। লোক পাঠিয়ে নারিটের বাড়ি থেকে কবিকে তাঁর বাড়ীতে আনতেন। কয়েকদিন রেখে দিয়ে পুজো সংখ্যার জন্য বেশ কিছু ছড়া কবিতা লিখিয়ে নিতেন। বই বেরোলে দেখা যেত নবকৃষ্ণের নাম নেই। যোগীন্দ্রনাথ। এমন ঘটনাও হাজার হাজার রয়েছে যেখানে দেখা গিয়েছে প্রকাশকরা কেউ তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বই বা পঞ্চম শ্রেণির ইতিহাস বই , বহু স্কুল পাঠ্য বই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে যেত , তার জন্য টাকা দিত বাবাকে । কিন্তু বইয়ে তাঁর নাম থাকত না , নাম থাকত শুধুমাত্র প্রকাশকদের।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV