সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , রায়গঞ্জ : বিয়ে, দুই হাত চার হাত এক হওয়ার দিন। এমন দিনেই নজির গড়লেন ওঁরা। দুই জীবন জোড়ার আগেই ওঁরা মরণোত্তর অঙ্গদান করেন। ‘আনন্দ’ সিনেমার ‘জিন্দেগি লম্বি নেহি, বড়ি হোনি চাহিয়ে’ সংলাপের মতোই যেন ছিল ওঁদের অঙ্গীকার। রায়গঞ্জবাসী পারমিতা ও সুজন এমনই এক কাজ করে ফেলেছে যা জীবনটাকে বড় করে দেখার মতোই।

দিন কয়েক আগে বিয়ের কনেকাঞ্জলির দানের চিরকালীন প্রথা ভেঙে ভাইরাল হয়েছিলেন এক নববধূ। নিয়ম ভেঙেছে পারমিতাও, তবে একা নয় সুজনকে সঙ্গে নিয়ে। যথারীতি ‘রায়গঞ্জ মুক্তির কাণ্ডারি’-সোশ্যাল পেজ থেকে ভাইরাল ওঁদের ছক ভাঙা বিয়ের আয়োজন। ‘রায়গঞ্জ মুক্তির কাণ্ডারি’ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা।

সংস্থার সদস্যদের পক্ষে কৌশিক ভট্টাচার্য বলেন, “এই উদ্যোগটা মূলত মেয়ের নিজের ছিল। ওঁর বাবাও সমাজ সেবা করতে ভালোবাসতেন। বছর দুয়েক আগে মারা যান। ওনারও মেয়ের বিয়েটা কোনও সমাজ সেবা মূলক কাজের মাধ্যমে হোক এমন ইচ্ছা ছিল। মেয়েও সমাজ সেবার বিভিন্ন কাজে যুক্ত। বাবার ইচ্ছা এবং নিজের কাজকে পারমিতা বজায় রেখেছে ওঁর বিয়েতে।” দুজনেই সবার প্রথমে অঙ্গদান করে। আরও অনেক সামজ সচেতনতা মূলক কাজের আয়োজন করা হয়েছিল ২৭ জানুয়ারির ওই বিয়েতে।

প্রাইমারী স্কুল শিক্ষিকা পারমিতা শ্বশুরবাড়িরও এই উদ্যোগে সহমত ছিল। কৌশিক ভট্টাচার্য বলেন , “সুজনের বাড়িতে আগেই জানানো হয়েছিল। কারন যারা নিমন্ত্রিত হবেন তাঁদেরকে রক্তদানের জন্য আবেদন করা হবে এটার সঙ্গে পাত্রের পরিবার কতটা সহমত হবে সেটাও জানার প্রয়োজন ছিল। তবে পাত্রের পরিবার এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। যার জন্য কোনওরকম সমস্যাই হয়নি।”

কৌশিকবাবু নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ সর্বপ্রথম ইতিহাস তৈরি হল পারমিতা সুজনের বিয়ের অনুষ্ঠানে ।অন্য পাঁচটা বিয়ের বাড়ি থেকে এখানে ছিল একটু অন্য ধরনের বিয়ে।” ওইদিন রায়গঞ্জের নটরাজ অনুষ্ঠান ভবনে সন্ধ্যা ৬টায় বর আসে। এরপরে শুরু হয় স্বেচ্ছায় রক্তদান। পাত্র পাত্রীর আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব আমন্ত্রিত অতিথিরা রক্তদানে এগিয়ে আসেন। সবমিলিয়ে ২২ জন রক্ত দেন।

আমন্ত্রিত অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় মেহগনি গাছ। প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের বন্ধের আবেদন জানিয়ে তুলে দেওয়া হয় কাপড়ের ব্যাগ। এরপরে পাত্র-পাত্রীর মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার পত্রে স্বাক্ষর প্রদান করে। কৌশিকবাবুর কথায় , “ওঁদের বিয়ের কার্ডও কলকাতার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার থেকে তৈরি করানো হয়েছিল। ওঁদের মনে হয়েছিল যে হ্যান্ডমেড কার্ড অনাথ শিশুদের হাতে তৈরি হলে তাদের অন্তত কিছুটা সাহায্য করা হবে। সেই ভাবনা থেকেই এই কাজ।”

এছাড়াও ডিজে বাজি পোড়ানো বনধের দাবিতেও প্রচার চালানো হয়ে বিয়ের মণ্ডপে। থার্মোকলের পাতা গ্লাস ব্যবহার বনধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সচেতনতা মূলক বার্তা দেওয়া হয়। ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিকের বদলে মাটির গ্লাস। তারপর ভবঘুরে অসহায় মানুষদের খাদ্য দানও করেন দম্পতি।