সুমন ভট্টাচার্য: নিঃশ্বাস ওঁরও বন্ধ হয়ে আসছে। কাতর স্বরে তিনি বারবার সেই কথা বলেও ছিলেন। কিন্তু তবু ন’মিনিট ধরে তাঁকে সেই অবস্থাতেই চেপে ধরে রাখা হয়েছিল।

জর্জ ফ্লয়েড।

গত বছর যে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনীর মৃত্যুতে গোটা আমেরিকা উত্তাল হয়ে উঠেছিল, এবং আমরাও বিস্ফারিত চোখে দেখেছিলাম কীভাবে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার তাঁকে, মানে জর্জ ফ্লয়েডকে মাটিতে ফেলে ঘাড়ের উপর চাপ দিয়ে তাঁর শ্বাসরোধ করে রেখেছিল। ৯ মিনিটের সেই ভিডিও শুধু আমেরিকাকে গত ৫০ বছরে সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলন দেয়নি, একই সঙ্গে গোটা বিশ্বকে আলোড়িত করেছিল।

মঙ্গলবার আমেরিকার আদালত জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক সোভিনকে দোষী সাব্যস্থ করে রায় ঘোষণা করেছে। স্বভাবতই মার্কিন রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এটা সেদেশের গণতন্ত্রের জন্য অন্যতম স্মরণীয় দিন। আমেরিকা কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারের দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরাও এই দিনটা ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি এসেছে মার্কিনমুলুকের প্রথম মহিলা ভাইস প্রেসিডেন্ট, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা হিসেবে যিনি সেদেশের এই সর্বোচ্চ পদে পৌঁছেছেন, সেই কমলা হ্যারিসের কাছ থেকে। ভারতীয় বংশোদ্ভুত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই রায় ঐতিহাসিক। কিন্তু তা কয়েক শতাব্দী ধরে চলতে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচার, বা জাতিবিদ্বেষের ইতিহাসকে মুছে দেয় না।

প্রাক্তন পুলিশকর্মী ডেরেক সোভিনের শাস্তি যদি আমেরিকায় সমানাধিকারের আন্দোলনের জন্য অন্যতম জয় হয়, তাহলে কমলা হ্যারিসের মন্তব্য আসলে অতি-দক্ষিণপন্থী বা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি সজোরে থাপ্পড়। হ্যারিস যা বলেছেন তা আসলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাঁরা মানুষের সমানাধিকারের জন্য, সংখ্যালঘুদের মর্যাদার জন্য লড়াই করছেন, তাঁদের শক্তি যোগাবে। এবং হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাবে পুলিশের উর্দি পরে কেউ কোনও কিছু করলেই সেটা সঠিক বা অনিবার্য সত্য হতে পারে না। কমলা হ্যারিস সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যে কথাগুলো বলেছেন, আসলে সেই প্রত্যেকটাই হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মতো এবং আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়, যে কোনও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা কীভাবে লড়তে হবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘ভুলে যাবেন না আজকে আমাদের হাতে মোবাইল ফোন বা স্মার্ট ফোন আছে বলে অনেক কিছু রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে। আমরা জানতে পারছি কৃষ্ণাঙ্গদের ঠিক কী ধরনের আচরণে সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এই অত্যাচারেরও একটা লম্বা ইতিহাস আছে।’

জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে যখন আমেরিকা উত্তাল হয়ে উঠেছিল এবং মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন শহরে হাজারে হাজারে মানুষ নেমে প্রতিবাদ করছিলেন, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছিলেন। বোধহয় সেটাই অতি-দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বা আধিপত্যবাদের লক্ষণ। কিন্তু ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ এই স্লোগান শুধু আমেরিকাকে উত্তাল করে তোলেনি, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে জো বাইডেনের জয়েরও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনের ফল ঘোষণা হওয়ার পর তাই কমলা হ্যারিস, যিনিও তাঁর গায়ের রঙের জন্য অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ না হওয়ার জন্য বহু আলোচিত ও বিতর্কিত, সেই কমলা হ্যারিস ডেমোক্র্যাটদের জয়কে আসলে ‘কালার্ড’ মহিলাদের জয় বলে উল্লেখ করেছিলেন।

অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে আদালত রায় ঘোষণা করার ফলে তাই জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস শুধু ফোন করে জর্জ ফ্লয়েডের লোকজনদের সঙ্গে কথা বলেননি, আমেরিকাকে আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন এই দিনটা কেন ঐতিহাসিক ভাবে এত তাৎপর্যপূর্ণ। জর্জ ফ্লয়েডের খুনির শাস্তির পরেই তাই মার্কিনমুলুক জুড়ে দাবি উঠতে শুরু করেছে, অন্য অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধেও মামলা শুরু করার জন্য, যারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের হত্যা করেছেন। আসলে এই দাবি উঠাটাও কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষমতায়নের বা সমান অধিকার পাওয়ার প্রচেষ্টার একটা অঙ্গ। সেই জন্যই নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে শুরু করে সব প্রধান মার্কিন সংবাদপত্র এই রায় এবং তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে এত উচ্ছ্বসিত। এই উচ্ছ্বাসের একটা বড় কারণ অবশ্যই মার্টিন লুথার কিং, বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, যা আমেরিকায় সমানাধিকার সুনিশ্চিত করার অন্যতম মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়, সেই আন্দোলন এই রায়ের মধ্য দিয়ে আমেরিকার বিচারব্যবস্থার এবং প্রশাসনের পূর্ণ সৎব্যবহার করতে পারলো।

‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আমেরিকায় শুরু হলেও গোটা বিশ্বকে নড়িয়ে দিয়েছিল। আধিপাত্যবাদ এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদকে কড়া প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গাতেও সেই সময় এই আন্দোলন ছড়িয়ে পরে এবং তথাকথিত বহু আইকনের মূর্তিকে উপড়ে ফেলা হয়, তারা আসলে দাসপ্রথার নামে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচারকে সমর্থন করেছিলেন বলে। আমেরিকা এবং ইউরোপের এই আন্দোলন আসলে আমাদের শেখায় ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ভারতবর্ষেও যাঁরা আধিপত্যবাদ কায়েম করতে চান, তাঁরা এটা স্মরণে রাখলে মঙ্গল।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.