সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : সত্যজিত রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছবি। গুগলে সার্চ করলেই একটি ছোট্ট ছেলেকে পাশে নিয়ে বিশ্বকবি কিছু কথা বলছেন। এই ছবিটি চলে আসে। তথ্যটি মারাত্মক ভুল। জানা যায় কেউ এই ছবি নিয়ে কেন মুখ খোলেনা তবু বাস্তব তো সেই কথাই বলে। ছবিতে রবির সঙ্গে অই ছোট্ট ছেলেটি তাঁর প্রিয়তম অভিজিৎ চন্দ। সেই অভিজিৎকে প্রতিদিন লজেন্স দিতেন ওঁর রবি দাদু। কিন্তু ২২ শ্রাবণ, সেদিন কেমন ছিলেন ছোট্ট অভিজিৎ যিনি সত্যজিত হিসাবে ভাইরাল নেট দুনিয়ায়। কেমন ছিল ভাইরাল ওই ছবির শিশুর অভিব্যক্তি?

দুপুরবেলা, রবীন্দ্রনাথ সব জাগতিক বন্ধন ছিঁড়ে পাড়ি দিয়েছেন অমৃতলোকে। ঘরে ভিড় উপছে পড়ছে, অভিজিতের কথা কারও মনে নেই। যেমন আজও অজানা অভিজিত রবীন্দ্রনাথের আসল কথাহুলি। ভাইরাল হয়ে যায় সত্যজিতের নামে। ‘গ্রেট উইথ এনাদর গ্রেট’ নামে। সেদিন ভিড়ের ভিতরই একটু ফাঁক করে পথ করে নিয়ে বিদ্যুতের মত এসে দাঁড়িয়েছিল সে। সেদিন এসে সে আর ‘বাপ, মানি, খোকন’ এই অদ্ভুত অঙ্কের তিন লজেন্স চায়নি তাঁর রবি দাদুর থেকে। সেদিন একটিও কথা ছিল না তাঁর মুখে। যে অভিজিৎ গম্ভীর দিনে রবিকে কথা বলিয়ে ছাড়তেন , যে অভিজিতকে অপারেশনের আগে দেখে তাঁর হাতে লজেন্স না দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে যেতেন কবি সেই রবি আজ শান্ত। একরাশ আশঙ্কায় বহু প্রশ্ন নিয়ে সেদিন শান্ত ছটপটে অভিজিৎ। তাঁর রবি দাদুকে সেদিন সাদা চাদরে আবক্ষ ঢাকা। দাদুকে দেখে সে স্তব্ধ। তারপর যখন ফুলে ফুলে ঢাকা গুরুদেবের দেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নীচে। হাজার লোকের ভিড়ের মাঝে একটি শিশু কণ্ঠ চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল – ‘দাদুকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওরা? অমন করে নিয়ে যাচ্ছে কেন? দাদুর যে কষ্ট হবে’। হ্যাঁ, কষ্ট তো হয়েছিল রবির। শেষ ইচ্ছা যে পূরণ হয়নি।

চেয়েছিলেন শান্তিকেতনের শান্ত ছায়ায় থেকে চলে যেতে। হয়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়। ‘জয় বিশ্বকবি কি জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দেমাতরম’ নানা স্লোগান, হইচইতে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছিল মহাপ্রস্থানের পথে। প্রসঙ্গত বাইশে শ্রাবণের সেই দিন থেকে অভিজিত আর কোনোদিনই কারও কাছ থেকে লজেন্স নেয় নি।

কিন্তু এই অভিজিৎ কে? তিনি রবীন্দ্রনাথের সচিব অনিল চন্দ ও তাঁর স্ত্রী রানী চন্দের একমাত্র পুত্র। অভিজিতের জন্ম হয়েছিল কলকাতায়। জন্মের প্রথম বার যখন সে শান্তিনিকেতনে এসেছিল, রবীন্দ্রনাথ তাকে স্নেহভরে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন ‘এর নাম রইল অভিজিত’। শান্তিনিকেতনে তখন অভিজিতই একমাত্র শিশু। শিশুকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কত আগ্রহ, তার সমস্তটাই তাঁকে মুগ্ধ করে রাখত। অভিজিতকে রবীন্দ্রনাথ আদর করে ডাকতেন ‘যুবরাজ’।

জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই অভিজিত চিনেছিল রবীন্দ্রনাথকে। চলতে যখন শেখেনি, তখন থেকেই ভোরে ঘুম থেকে উঠে চোখমুখ ধুয়ে মায়ের কোলে চড়ে বাইরে এসে যার মুখ আগে দেখত সে, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তখন থেকেই তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল – ভোরে উঠে সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথের কাছে আসা। অভিজিত রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে দাঁড়ালেই, রবীন্দ্রনাথ লেখার টেবিলের উপরে রাখা কাঁচের বৈয়াম থেকে তিনটি লজেন্স দিত ওর হাতে; এই ভাবে অভিজিতের দিন শুরু হত। কি যে হিসাব ছিল ছোট্ট অভিজিতের – তিনটের বেশি লজেন্স সে কোনওদিনই নিত না।

এক এক দিন রবীন্দ্রনাথ বইয়ামের মুখ খুলে অভিজিতের সামনে ধরতেন, অভিজিত হাত ডুবিয়ে এক মুঠো লজেন্স তুলে নিত, নিয়ে হাতের তেলোয় সেগুলো মেলে ধরে গুনত – ‘বাপ, মানি, খোকন’ – এই তিনটে রেখে বাকি লজেন্সগুলো বৈয়ামে ফেলে দিত। রবীন্দ্রনাথের তখন খুব আনন্দ হত, তিনি সব্বাইকে ডেকে বলতেন – এমন নির্লোভ ছেলে আমি দেখি নি। ‘বাপ, মানি, খোকন’ – এই ছিল তার গণনার পদ্ধতি – আর এটা ওরই সৃষ্টি। সবাই ওর গোনা দেখে হাসত, মজা পেত। প্রতিদিন ভোরে এই তিনটি লজেন্স তার চাই।

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।