স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: শহরের নাম করা পুজোর মধ্যে একটি হল বর্ধমানের খাজা আনোয়ার বেড়ের জমিদার দাসবাড়ির পুজো৷ এই বছর দাসবাড়ির পুজো ১৫০ বছরে পদার্পণ করছে৷ একসময় বর্ধমানের খাজা আনোয়ার বেড়ের জমিদার দাসবাড়ির পুজো দেখতে আসতেন খোদ বর্ধমানের মহারাজা আর তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

এই দাসবাড়ির পুজোর প্রচলন করেছিলেন তত্কালীন জমিদার ব্রজেন্দ্রলাল দাস। একে জমিদার, তার ওপর খোদ বর্ধমান রাজ পরিবারের সঙ্গে দু’বেলা নিত্য সম্পর্ক। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই৷ এত সম্পত্তির উত্তরাধিকার কোথায়? সেই চিন্তায় রীতিমতো দিনরাত এক হয়ে যাওয়ার জো তাঁর৷ ঠিক সেই সময় দেবী হরগৌরী স্বপ্নে দেখা দিলেন ব্রজেন্দ্রলালকে। জানিয়েছেন, একদিন ঘুমের ঘোরেই দেবী হরগৌরী ব্রজেন্দ্রলাল দাসকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দেন৷ আর এই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর সেই বছরই দুর্গাপুজোর প্রচলন হয় জমিদার দাস পরিবারে।

এমনকি স্বপ্নাদেশ মোতাবেক তৈরি হয় দেবীর মূর্তিও। বর্তমানে নয় নয় করে ১৫০ বছরেরও বেশি পুরনো সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিলেন ব্রজেন্দ্রলাল দাসের নাতি শিবশংকর দাস। তিনি জানান, একচালার কাঠামোয় বসে থাকা দেবীর ডান পাশে বসে আছেন দেবাদিদেব শিব। শিব-পার্বতীর দু’পাশে লক্ষ্মী আর সরস্বতী থাকে। তাদের নীচে বসে কার্তিক আর গণেশ।

শিবশংকরবাবু আরও জানিয়েছেন, জমিদার ব্রজেন্দ্রলাল দাসের কোনেও পুত্র সন্তান ছিল না। এই হতাশাই কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিচ্ছিল বর্ধমানের খাজা আনোয়ার বেড় এলাকার দাপুটে জমিদার তথা বর্ধমানের মহারাজার বিশিষ্ট বন্ধু ব্রজেন্দ্রলাল দাসকে। কথিত আছে, দেবীর সেই স্বপ্নাদেশের পর মহাসমারোহে হরগৌরীর মূর্তি তৈরি করে পুজোর পরই ব্রজেন্দ্রলাল দাস পুত্রলাভ করেন। দেবীর স্বপ্নাদেশে পাওয়া বলে একমাত্র পুত্রের নাম রাখেন দুর্গাচরণ দাস। তিনি জানিয়েছেন, ওই ঘটনার রেশ ধরেই এখনও বর্ধমানের এই দাস পরিবারে দেবীর মাহাত্ম্য চলে আসছে।

তবে দাস পরিবারে এখনও কোনও কন্যা সন্তান জন্মায়নি। ব্রজেন্দ্রলাল দাসের একমাত্র পুত্র দুর্গাচরণ দাস। দুর্গাচরণবাবুর দুই ছেলে। বড় ছেলে বীরেশ্বর দাস এবং শিবশংকর দাস। এক বছর আগে বীরেশ্বরবাবু মারা গিয়েছেন। তাঁরও তিন পুত্র সন্তান। শিবশংকর বাবুরও এক পুত্র। শিবশংকরবাবু জানিয়েছেন, তখন জমিদারী ছিল। পুজোর জাঁকজমক আর জৌলুসও ছিল নজরকাড়া। জমিদার বাড়ির পুজো বলে কথা। ব্রজেন্দ্রলালবাবুর আমল থেকেই দাসবাড়ির দুর্গাপুজো হয়ে আসছে পঞ্চমী থেকে।

পঞ্চমীতে বোধনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু পুজোর যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান। আগে পুজো উপলক্ষে দালানে নিয়ম করে বসত যাত্রাপালা, গানের আসর। দুর্গা মণ্ডপ লাগোয়া দোতলার ঘর থেকে অন্দরমহলের মহিলারা তা উপভোগ করতেন। দাসবাড়ির পুজোর বিশেষত্ব বলতে কাঁঠালী কলা, নারকেলের বিভিন্ন মিষ্টি আর গাওয়া ঘি-এর লুচি। প্রত্যেকদিনই দেবীর কাছে এই ভোগ নিবেদন করা হয়। এখনও দাসবাড়ির দুর্গা মণ্ডপের দিকে তাকালেই এক সময়ের রমরমার চিহ্ন বোঝা যায়।

তিনি জানিয়েছেন, দাসবাড়ির দুর্গাপুজোয় ১০৮ টি পদ্ম দেওয়ার রীতি রয়েছে। কিন্তু প্রায় বছর ১২ আগে একবার পদ্মের আকাল দেখা দিল। কোনও রকমে তাঁরা ১২টি পদ্ম জোগাড় করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পুজোর আগেই এক বৃদ্ধা এসে বাকি পদ্ম নামিয়ে রেখে যান মণ্ডপে। তার পরে আর কেউ দেখেননি ওই বৃদ্ধাকে। অষ্টমীর দিন সন্ধিক্ষণে এখনও দুর্গা মণ্ডপের ওপর শঙ্খচিলকে উড়তে দেখা যায় বলে দাবি পরিবারের। শিবশংকরবাবু জানিয়েছেন, দশমীর দিন দেবীকে বিসর্জন করা হয় বাড়ির পাশের মল্লিকপুকুরে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তখনও আকাশে উড়তে দেখা যায় শঙ্খচিলকে৷

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও