সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: হাড় ভাঙার মতো মড়মড় করে শব্দ। জেসিবি মেশিন এভাবেই ভাঙ্গাচোরা মূর্তিগুলোকে ফেলছে ডাম্পারে। গঙ্গা বাঁচাতে এটাই সেরা পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। আদতে কি এতে প্রকৃতির ক্ষতি এড়ানো যাচ্ছে? ভাঙাচোরা মূর্তি আম বাঙালির বিশ্বাসে আঘাত দিচ্ছে না তো? দ্বিধাবিভক্ত আম জনতা এবং পরিবেশবিদ।

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন করতে দেওয়া হয় না। গঙ্গার নাব্যতা রক্ষায় রাজ্য সরকার মূর্তি জলে পড়ার আগেই তা ক্রেন দিয়ে তুলে নেয়। এরপর জেসিবি দিয়ে তা তুলে ফেলা হয় ময়লা নিয়ে যাওয়ার গাড়িতে। পরে ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে তা ফেলে দেওয়া হয়।

বারোয়ারী পুজোয় যারা বিসর্জন করতে আসেন বা যারা বিসর্জন দেখতে আসেন রাজ্যের বিভিন্ন ঘাটে তারা দেখতে পান মৃন্ময়ী দেবী মূর্তি জেসিবি দিয়ে তুলে ফেলা হচ্ছে ময়লার গাড়িতে। অনেকেই এই দৃশ্য মেনে নিতে পারছেন না। গঙ্গায় ঠাকুর ভাসানের পর ছলছলে চোখে ‘মা’-কে বিদায় দেওয়ার চেয়ে মূর্তি ভেঙে , দুমড়ে মুচড়ে ময়লা ফেলার গাড়িতে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য পীড়াদায়ক বলে জানাচ্ছেন।

অনেকেই বলছেন , এছাড়া কি আর কোনও পদ্ধতি নেই? শনিবারই বাবুঘাটে খান পঞ্চাশে মূর্তি নিরঞ্জন হয়েছে। এদের মধ্যেই যোধপুর পার্কের এক পূজো উদ্যোক্তা স্বপন বাড়ুই বলেন,”এই দৃশ্যটা চোখে দেখা যায় না। অন্য কিছু করা গেলে ভালো হয়।” ধর্মতলার ওয়েলিংটন থেকে বিসর্জন দেখতে এসেছিলেন সুমিত্রা ঘোষ। তিনি বলেন, “জল পড়ার আগেই ক্রেনে করে যেভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এ দৃশ্য বড়ই খারাপ। দুর্গা মূর্তি পাঁচদিন পর প্রাণহীন হতে পারে। তা বলে এতটাও নয়।”

উত্তর কলকাতার এক ছোট ক্লাবের প্রতিমা নিরঞ্জন হচ্ছিল। জলে যাতে মূর্তি না পড়ে তাই কলকাতা করপোরেশন একটি দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে ঘাট থেকে জেটি পর্যন্ত। উত্তর কলকাতার ওই সর্বজনীনের মূর্তি মুটের দল জলের দিকে ফেলার আগে থেকেই ওই পূজো উদ্যোক্তা বলে যাচ্ছিলেন, ‘আরও একটু এগিয়ে কাঠামোটা ফেলতে পারে।’ প্রতিমা ঠেলে দেওয়া হল।

দেখা গেল মাথা থেকে ধর আলাদা হয়ে গেল মৃন্ময়ী মায়ের। দেখেই ওই ক্লাব কর্তা বলে উঠলেন ‘উফফফ…বলছিলাম না এগিয়ে নিয়ে ঠেলতে পারত। মাথা থেকে ভেঙে গেল।’ বিশ্বাসে আঘাত। পাশাপাশি অনেকে মনে করছেন এই পদ্ধতিতে প্রকৃতির সঠিক সংরক্ষণ হচ্ছে না। দাবি, কাঠামো তৈরি হয় আম কাঠ দিয়ে। ডাম্পারে ফেলার আগে কাঠামো দুমড়ে মুচড়ে ফেলা হয়। তাই ওই কাঠামো নতুন করে ব্যবহার করা যায় না। ফলে প্রত্যেক বছর নতুন করে গাছ কেটে কাঠামো বানাতে হচ্ছে। রি-সাইকেল করা গেলে কিছু গাছ অন্তত বাঁচতে পারে।

কিন্তু গঙ্গা বাঁচাতে সরকারের ডাম্পিং পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনও পদ্ধতি কি রয়েছে? যা একইসঙ্গে মনে আঘাত দেবে না আবার সবুজও বাঁচাবে। অনেকের বিধান, যদি ঘাটেই গঙ্গার জল দিয়ে মূর্তি গলিয়ে দেওয়া যায়!

এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। তিনি বলেন,”ধর্ম বিশ্বাস , তাতে আঘাত নিয়ে আমি কিছু বলব না। পরিবেশ রক্ষা নিয়ে বললে আমি বলব, কুড়ি বছর ধরে এই বিসর্জনের পদ্ধতি এবং গঙ্গা , প্রকৃতি সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছি। জলের সোর্স যদি গঙ্গা হয় তাহলে ওই কেমিক্যাল রং সমেত জল গিয়ে মিশবে সেই গঙ্গাতেই। এতে দূষণ বাড়বে বই কমবে না।”

একইসঙ্গে পরিবেশবিদের যুক্তি, “যদি আম জনতার ঘরে ঘরে সরবরাহ করা জল দিয়ে মূর্তি গলাতে হয় তাহলে যে পরিমাণ জল নষ্ট হবে তা ধারণার বাইরে। বারোয়ারি দুর্গা মূর্তি পাঁচটা ভাগে ভাগ করা থাকে। প্রত্যেকটি মূর্তি আলাদা করে গলাতে হবে।

পাশাপাশি প্রধান মূর্তিতে একসঙ্গে বিরাজমান দেবীসহ বিশাল সিংহ এবং বৃহদাকার অসুর, সঙ্গে মহিষ। শক্ত মাটি গলাতে গ্যালন গ্যালন জল খরচ হয়ে যাবে। সহজে মূর্তি গলবে না। দু দিন তো ছাড়ুন দুই ঘণ্টা জল না পেলে যারা ডাম্পিং পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারাই হইহই করবেন। আমার মনে হয় ওঁদের প্রশ্ন যুক্তিসম্মত নয়। যেভাবে এখন গঙ্গা থেকে মূর্তি তোলা হয় এটাই সঠিক পদ্ধতি।”