সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

আইএমএফকে সরকারি ভাবে সরাসরি ‘না’ বলেছেন গ্রিসের অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারাউফাকিস। তবে কি এবার এক নতুন ট্রাজেডির পথে কি সফোক্লিসের দেশ? শেষ মুহূর্তে নতুন কোনও রফাসূত্র না মিললে, খোলাখুলিই ঋণখেলাপির তকমা পেতে হবে গ্রিসকে। আর তেমনটা ঘটলে ইউরোপের ‘সভ্য’ গ্রিসকে বসতে হবে সুদান কিংবা জিম্বাবোয়ের মতো দেশগুলির সঙ্গে এক সারিতে। প্রাচীন সভ্যতার আভিজাত্য মাটিতে মিশবে নাকি! এর আগে ২০০১ সালে শেষ আইএমএফের ঋণখেলাপি হয়েছিল জিম্বাবোয়ে ৷ তবে গ্রিসের সেই ট্র্যাজেডি কোন দিকে মোড় নেবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে আগামী ররিবারের গণভোট পর্যন্ত ৷ যদিও এই পরিস্থিতিতে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস আইএমএফের কাছে কাতর আর্জি জানিয়েছেন, বার্তা দিয়েছেন কয়েকটি ছোট খাট শর্ত বাদ দিলে প্রায় সব শর্তই মানতে তিনি রাজি৷ চেয়েছেন নতুন ধরনের তৃতীয় ‘বেল আউট’ ব্যবস্থা ৷ তবে যা পরিস্থিতি, তাতে গ্রিসের পাশে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত আর্থিক দিক থেকে সমৃদ্ধ দেশগুলি কতটা দাঁড়াবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে৷বিশেষত প্রধান ঋণদাতা জার্মানির নেত্রী অ্যাঞ্জেলা মারকেল গণভোটের আগে কোনও রকম রফায় আসতে রাজি নন৷ ফলে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে সোলোন-সক্রেটিসের ঐতিহ্যবাহী দেশে৷
কথা ছিল, মঙ্গলবার ৩০ জুনের সন্ধে ছটার মধ্যে গ্রিসকে আইএমএফের পাওনা ১৬০ কোটি ইউরো (১৮০ কোটি ডলার) মেটাতে হবে৷ কিন্তু সেদেশের ভাঁড়ার তো শূন্য৷শূন্য অনেক দিনই৷ এর আগে তাদের আর্থিক সংকট কাটাতে সাহায্য পাঠিয়েছিল ডঃ মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার৷ তার জন্য দেশে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীকে অনেক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছিল৷ কিন্তু তাতেও যে সংকট ঘোচেনি গ্রিসের বর্তমান অবস্থাই তার প্রমাণ৷ ফুটো কলসীতে জল ঢেলে কি কোনও লাভ হয়?
এই অবস্থায় ঋণ মেটানোর নির্ধারিত অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই গ্রিস নয়া বেল-আউটের প্রস্তাব রাখে৷ অবশ্য এহেন পরিস্থিতিতেও আইএমএফের পক্ষ থেকে গ্রিসকে সরাসরি দেউলিয়া আখ্যা না দিয়ে শুধু ‘বকেয়া অর্থ’ মেটানোর কথাই বলা হয়েছে৷ ‘ইউরোপিয়ান স্টেবিলিটি মেকানিজমে’র কাছে এথেন্সের অনুরোধ ছিল, নতুন ২৯০ বিলিয়ন ইউরো পেলে তাদের যাবতীয় আর্থিক প্রয়োজন মিটবে এবং আগামী দুই বছরের জন্য ঋণ পুনর্গঠন করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে৷
এই অবস্থায় আবার দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোচনের পন্থা নিরূপণে গ্রিসের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে ৷একপক্ষ বলছেন সরকারি ব্যয় সংকোচ আর কর বাড়ানোর শর্ত মেনে আন্তর্জাতিক ত্রাণ প্রকল্পে সায় দেওয়া উচিত৷ আর এক পক্ষের মত হল, ইউরো-র কবল থেকে বেরিয়ে যেতে হবে৷তবেই মিলবে পরিত্রাণ৷আর এই বিষয়েই আগামী রবিবার গণভোটে রায় দেবে গ্রিসবাসী৷
এর মধ্যেই অসংখ্য মানুষ মঙ্গলবার ঋণদাতা দেশগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে রাজধানী এথেন্স সহ বিভিন্ন শহরের পথে পথে। বিক্ষোভকারীদের ব্যানারে লেখা, ‘‘আমরা ঋণদাতাদের হাতের পুতুল নই।’’ বেকারত্বের সমস্যায় নাজেহাল নাগরিকদের বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘আমরা ইউরো চাই না, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।’’
বিভিন্ন সমীক্ষক সংস্থার মত হল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেঁধে দেওয়া শর্ত মেনে ত্রাণ নেওয়ার বিপক্ষে ভোট দেবেন অনেকেই৷ যদিও অর্থনৈতিক সংস্কারপন্থীরাও পিছিয়ে নেই। এর মধ্যেই এথেন্সের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
সম্প্রতি এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, এত উত্থানপতনের মাঝেও প্রায় ৬৭ শতাংশ গ্রিসবাসী ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতেই আগ্রহী। যদিও ‘না’-এর পক্ষে রয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজৎ সহ বহু বিশেষজ্ঞই। তাঁদের আশঙ্কা, আবার ব্যয় কাটছাঁটের শর্তগুলি মানলে গ্রিসের অর্থনীতি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
গত পাঁচ বছরে ব্যয় হ্রাসের ফরমুলা প্রয়োগ করে গ্রিসের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। চলছে পেনশন ছাঁটাই৷ প্রতি চার জনে একজন বেকার৷ তার থেকে ইউরো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মুদ্রায় ফিরে গেলে আখেরে গ্রিসের সুবিধা হবে বলেই মনে করেছেন এঁরা৷ অন্যদিকে গ্রিসের ঋণ ফেরতের ক্ষমতার রেটিং কমিয়ে দিয়েছিল মূল্যায়ন সংস্থা এস অ্যান্ড পি। আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা একেবারে তলানিতে নেমেছে, সিসিসি-মাইনাসে। আবার আর এক মূল্যায়ন সংস্থা ফিচয়ের সতর্কবার্তা, গোটা ইউরোপের আর্থিক সমৃদ্ধিকে টেনে নামাতে পারে গ্রিক সংকট।Greek
গ্রিসের এমন সংকটের দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া হল্যান্দেকে সঙ্গে নিয়ে নতুন একটি ঋণ প্যাকেজ তৈরি করতে চাইছেন তিনি। যার সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে গৃহীত মার্শাল প্ল্যানের অনেক মিল আছে৷ এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ওবামা জানিয়েছেন, গ্রিসের পরিস্থিতির উপর তাঁর প্রশাসন নজর রাখছেন৷আরও দাবি করেছেন, এই সংকট মেটাতে নেমে তাঁর দেশ সমস্যায় পড়বে না৷ তাছাড়া গ্রিস যাতে ইউরোপে থেকেই সমৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে, সে জন্য তাঁরা আর্থিক সংস্কারের একটি রোড ম্যাপও তৈরি করে আগ্রহী ৷
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে পশ্চিমী দুনিয়ার সব চাইতে দুর্গত দেশটির একেবারে রসাতলে যাওয়া ঠেকানোর প্রচেষ্টা জারি রয়েছে৷রবিবারের গণভোটের পর দেখতে হবে, গ্রিসের নিয়তিতে কী লেখা আছে৷