শেখর দুবে: মনমোহন সিং-য়ের মতো একজন উচ্চশিক্ষিত এবং অর্থনীতি বিশারদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত৷ কিন্তু এটা সম্ভব হয়নি কারণ পিএমের চেয়ারে বসেও মনমোহনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পেছনে বাধা ছিলেন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী৷ ঠিক এই আইডিয়ার উপর নির্ভর করে ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটি তৈরি হয়েছে৷ সঙ্গেই রয়েছে ‘পিএমও বনাম পিএম’, ‘পার্টি বনাম পিএমে’র মতো কিছু বিষয়৷

২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচন জিতে প্রচন্ড জনমত থাকা সত্ত্বেও নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে নিজের বিশ্বস্ত সৈনিক মনমোহন সিং-কে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসালেন সোনিয়া গান্ধী৷ কিন্তু আদপে প্রধানমন্ত্রীর রাশ ধরে রাখলেন নিজের হাতেই৷ এইভাবে ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটির শুরু৷ সিনেমাটির পরিচালনা করেছেন রত্নাকর গাট্টে৷ আনকোরা পরিচালকের পরিচালনা থেকে বেশি কিছু আশা করা হয়ত ভুলই হবে৷ বিশেষ করে ট্রেলার যে রকম দমদার সেখান থেকে সিনেমা অনেকটা না পাওয়া রেখে যায়৷ দর্শকের মনে হতেই পারে পরিচালক সিনেমাটির অভিনেতাদের দিয়ে বারুর বই মুখস্ত করিয়ে পর্দায় বলিয়েছেন৷ তা সত্ত্বেও যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে হয় তা হয়,


এক- অনুপম খেরের অভিনয়৷ সিনেমার শুরু থেকে শেষ কোথাও মনে হয়নি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন ছাড়া অন্য কাউকে দেখছি৷ পুরো সিনেমা জুড়ে খুব অল্প কথা বলেও নিজের অভিনয়গুণে নিজের দিকে দর্শকদের চোখ ধরে রাখলেন খের৷

দুই- বেশ কিছুদিন পর সঞ্জয় বারুর চরিত্রে পর্দায় ফিরে সাবলীল অভিনয় করলেন অক্ষয় খন্না৷

তিন- প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ছবি পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানা না দেখাতে পারলেও কোথাও কিছু খারাপভাবে তুলে ধরা হয়নি৷

চার- সিনেমায় গল্প বলার ধরণ উপভোগ্য৷ বিশেষ করে পিএমওর ভেতরের পলিটিক্সকে যতটা সম্ভব সাধারণভাবে দর্শকের বোধগম্য করে তুলে ধরা প্রচেষ্টা রয়েছে ছবিটিতে৷ দু-একটি জায়গা বাদে অতি নাটকীয়তার ব্যবহার নেই৷

পাঁচ- দুর্বল স্ক্রিপ্ট৷ এই রকম সিনেমা পর্দায় আনার আগে শুধুমাত্র বারুর ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টারে’র উপর নির্ভর না করে আরও পড়াশোনা ও ডিটেলিং-এর প্রয়োজন ছিল৷ কারণ সিনেমাটিতে UPA-1 এবং 2-এর অন্যতম তিন চরিত্র সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, প্রণব মুখোপাধ্যায়, এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ পর্যন্ত নেই৷ 

ছয়- সিনেমাটিতে একটি ঘটনা থেকে আরএকটি ঘটনায় লাফ দেওয়া হয়েছে৷ দুটো আলাদা সিনের মধ্যে কোনও রকমে যোগ সূত্র রাখার প্রয়োজন মনে করেননি পরিচালক৷ মাঝে মাঝে মনে হয়েছে পরিচালক একটি সম্পূর্ণ সিনেমা নয় বরং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের জীবনের কিছু ঘটনাকে আলাদা আলাদা পার্টে ভাগ করে পর্দায় এনেছেন৷

সাত- কারণে অকারণে আসল মিডিয়া ক্লিপ ব্যবহার করা হয়েছে, পরিচালক বোধহয় সিনেমাটিকে খুব বেশি বাস্তবিক করতে চেয়ে এটা করেছেন৷ যার ফলে মাঝে মাঝে ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটিকে একটি ডকুমেন্টরি মনে হয়েছে৷

২০১৪, এপ্রিলে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের মুখে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ নামের একটি বই প্রকাশ করে৷ বইটির লেখক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রাক্তন মিডিয়া অ্যাডভাইসর সঞ্জয় বারু৷ ২০০৪ থেকে ২০০৮ এই চারবছর প্রধানমন্ত্রী মিডিয়া পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করার সময় পিএমও-কে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন বারু৷ প্রায় ৬ বছর পর নিজের অভিজ্ঞতাকে ৩২০ পাতার একটি বইয়ের রূপ দেন তিনি৷ বইটি সে সময়ই কংগ্রেস পার্টির চক্ষুশূল ছিল৷ সোনিয়া ম্যাডামের সমালোচনা আর যাই হোক কংগ্রেস মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক৷

কাকতালীয়ভাবে ২০১৯ ভোটের মুখে সঞ্জয় বারুর এই বইয়ের উপর নির্ভর করে বিজয় রত্নাকর গাট্টের পরিচালনায় ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে আসে৷ সেটা নিয়েও যথারীতি বিতর্ক তৈরি হয়৷ সিনেমা রিলিজের দিনে কংগ্রেসের সমর্থকরা হলের সামনে বিক্ষোভ দেখান৷ কিন্তু দুটো লোকসভা নির্বাচনের আগে দুরকমভাবে সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ এর পুরোটায় কি ‘কাকতালীয়’ বলে চালানো যায়? বোধহয় না৷ নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁকে পিএমের চেয়ারে বসানোর পেছনে থাকা লোকজন ‘প্রচার’ শব্দটির মানে যে ভালো মতোই বোঝেন এবিষেয়ে খোদ কংগ্রেসীরাও সহমত হবে৷

ছবি সৌজন্যে ট্যুইটার

নিজের পজিটিভ এবং বিপক্ষের নেগেটিভ বিষয়গুলো ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার বিষয়ে নিত্য নতুন পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন মোদীজী৷ ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ যে মোটেও অ্যাক্সিডেন্টালি ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে রিলিজ হয়নি সেটি সিনেমার ট্রেলার দেখেই আঁচ করা গিয়েছিল৷ সিনেমা হলে বসে সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়৷ সঞ্জয় বারুর, ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ থেকে রত্নাকর গাট্টে ঠিক সেই জিনিসগুলোই সিনেমায় দেখিয়েছেন যা ম্যাডাম সোনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধীকে অনেকাংশে এক্সপোজ করে৷ আর এতে যে কার লাভ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷

সিনেমা জগৎ-এ অনামী রত্নাকর গাট্টের কাছে সুযোগ ছিল বারুর বইটিকে নির্ভর করে একটি অসাধারণ রাজনৈতিক বায়োপিক উপহার দেওয়ার৷ কিন্তু সে চেষ্টা রত্নাকর মোটেও করেননি৷ নিউক্লিয়ার ডিল নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি এবং UPA-1 থেকে বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়া ছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন৷ যা এই সিনেমার কোথাও দেখানো হয়নি৷ তা সে পার্টির বিরুদ্ধে গিয়ে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের লোকসভার স্পিকার পদে থেকে যাওয়া হোক কিংবা সোনিয়া গান্ধী এবং মনমোহন সিং-এর মাঝে দাঁড়ানো গান্ধী পরিবারের রাজনীতির অন্যতম বড় শিকার প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ৷

‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটি বিজেপির ভোট প্রচার নাকি নয়, এর থেকেও বড় সিনেমার মাধ্যমে যা প্রচার করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা ঠিক না ভুল? সিনেমাটি এককথায় সোনিয়া এবং রাহুল গান্ধীকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে৷ কিন্তু সঞ্জয় বারুর বই হোক কিংবা সিনেমা কোনওটি সম্পর্কেই জোরালো বিরোধিতা কিংবা প্রতিবাদ আসেনি ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান ‘ম্যাডাম’-এর পক্ষ থেকে৷

নিজের শিষ্য সঞ্জয় বারুর বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-ও৷ ইউপিও-১ ও ইউপিএ-২ এর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন মনমোহন সিংকে যে ১০ জনপথ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হত তা বহুল চর্চিত বিষয়৷ এরকম একটি বিষয়ে বিজেপির আগ্রহ থাকাটা খুব স্বাভাবিক৷ কিন্তু প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কিংবা সোনিয়া গান্ধী কিন্তু এ বিষয়ে সেভাবে বিরোধিতার রাস্তায় না হেঁটে চুপই থেকেছেন বরাবর৷ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর এই মৌনতা অবশই ইশারাবহ৷ এবিষয়ে অনেকেই একটি প্রচলিত প্রাচীন প্রবাদের উল্লেখ করে থাকেন, ‘মৌনতা সম্মতির লক্ষণ৷’