তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: অবহেলা অনাদরে পড়ে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত চুন সুরকির বাড়ি ভাঙাকে কেন্দ্র করে আলোড়ন তৈরি হল জঙ্গলমহলের জেলা বাঁকুড়ার৷ জেলার সদর শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বড় কালীতলা এলাকায় রয়েছে ভাঙাচোরা একটি বাড়ি, যা এলাকার মানুষের কাছে ‘বিপ্লবী’ বাড়ি নামেই পরিচিত৷ সম্প্রতি গোপনে সেই বাড়িটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করে মালিকপক্ষ৷ বিষয়টি জানতে পারার পরই শহরের ‘নিদর্শণ সাহিত্য পত্রিকা’ গোষ্ঠী ও ‘বাঁকুড়া জেলা হিন্দু মহাসভা’র পক্ষে আলাদা আলাদা ভাবে সদর মহকুমা শাসকের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়। তারই ভিত্তিতে বাড়ি ভাঙার কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ জারি করেছে মহকুমা প্রশাসন৷

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও ঐতিহাসিক এই বাড়ি কেন সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হল না? এক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদাসীনতাকেই কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়েছে সংশ্লিষ্ট দুটি গোষ্ঠী৷  জেলা গবেষক মহল সূত্রে খবর, বাঁকুড়া শহরের ১২নম্বর ওয়ার্ডের বড় কালীতলা গার্লস হাইস্কুল সংলগ্ন একটি প্রাচীণ বাড়িতে বিপ্লবীদের আস্তানা ছিল। তৎকালীন সময়ে অনুশীলন সমিতির গোপন আস্তানা হিসেবেও এই বাড়ি ব্যবহৃত হত। এই বাড়ির মধ্যে থাকা একটি গোপন কক্ষে দিনের পর দিন পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে অনেক বিপ্লবীই আত্মগোপন করে থেকেছেন। এমনকি এমন তথ্যও পাওয়া যায় যে, এই বাড়ির সদস্য ধরণীধর মুখোপাধ্যায় নিজে বিপ্লবীদের সহায়তা করার পাশাপাশি সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

সেকারণেই এই বাড়ির উপর পুলিশেরও কড়া নজর থাকত। এমন ঘটনাও ঘটেছে বাড়িতে পুলিশ ঢোকার আগেই মজুত করা অস্ত্র পিছনে একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হত। যা তৎকালীন পুলিশ কিছুই টের পেত না। অবস্থানগত সুবিধার কারণে এই বাড়িকে কেন্দ্র করে পুলিশের চোখ এড়িয়ে বৈপ্লবিক কাজকর্ম চালাতে বিপ্লবীদের সুবিধা হত। এহেন ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি সম্প্রতি সংস্কারের নামে ভেঙে ফেলার তৎপরতা শুরু হয়৷ সামনের কিছুটা অংশ ভেঙেও ফেলা হয়৷ এরপরই ইতিহাসের ‘সাক্ষী’ এই বাড়িকে রক্ষার দাবিতে গর্জে ওঠে বাঁকুড়া শহরের বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন।

‘বাঁকুড়া জেলা হিন্দু মহাসভা’র পক্ষে সোমনাথ বরাট ও শান্তি অধিকারী লিখিতভাবে মহকুমা শাসককে লেখা আবেদনে ‘বাড়ি ভাঙ্গার কাজ বন্ধ করে’ সরকারকে অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের অনুরোধ জানান। ‘নিদর্শণ সাহিত্য পত্রিকা গোষ্ঠী’র পক্ষে বিপ্লব বরাট বলেন, ‘‘আনুমানিক ১৮৬৩ সালে বাঁকুড়া শহরের বড় কালীতলায় বাড়িটি তৈরি হয়। বিপিন বিহারী গঙ্গোপাধ্যায়, চারণ কবি মুকুন্দ দাসের মতো গুণী মানুষও এই বাড়িতে এসেছেন। দীর্ঘদিন এই বাড়িকে ঘিরে বৈপ্লবিক কাজকর্ম হওয়ায় বাড়িটি জেলার মানুষের কাছে ‘বিপ্লবী বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিতি৷ অনেক ইতিহাস গবেষক ও ছাত্র-ছাত্রী শহরে এসে এই বাড়ির খোঁজ করেন। এহেন ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বাড়ি আজও সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হয়নি৷ উল্টে পরিকল্পিতভাবে বাড়িটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে৷’’

পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনিক উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন তাঁরা৷ বিষয়টি জানতে পরই মহকুমা প্রশাসনের নির্দেশে বাড়ি ভাঙার কাজ ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে৷ মহকুমা শাসক বলেন, ‘‘সংশ্লিষ্ট বাড়িটির সম্পর্কে আমরা যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করব। তারপরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে৷’’