সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনি বিরোধী দলনেত্রী। তবু তাঁদের সম্পর্ক ছিল অন্য মাত্রার। বিরোধী নেতা রাজীব গান্ধীকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতেন বাম নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়। ততটাই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন রাজীবও। সাধারণ মানুষের কাছে অনেক কিছু অজানা থাকে। পুত্রসম রাজীবের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। এমনই ছিল সিপিআই নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায় এবং রাজীব গান্ধীর সম্পর্ক।

২১শে মে ১৯৯১, যেদিন আচমকা খবরটা পেয়েছিলেন গীতা মুখোপাধ্যায়। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না পুত্রসম রাজীবকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। সেদিন যেন চোখের জল থামতে চাইছিল মাতৃসম গীতা মুখোপাধ্যায়ের। সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বার বার গলা বুজে এসেছিল। সামলাতে পারেননি। ক্যামেরার সামনেই কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। আসলে বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ও গীতা মুখোপাধ্যায়ের একটিই সন্তান ছিল। তাকে নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ঠাণ্ডা লেগে মারা যায় সেই সন্তান।

সে আবার রাজীব গান্ধীর চেয়ে কয়েকদিনের ছোট বড় ছিলেন। গীতাদেবীর কোলে আর সন্তান দেননি ঈশ্বর। আর তাই রাজীবকে একটু বেশিই স্নেহের চোখে দেখতেন। পড়ে স্নেহের রাজীব যখন বিরোধীর আসনে তখনও কমেনি সেই স্নেহ। রাজীবও তেমনই সম্মান ও ভালোবাসতেন গীতাদেবীকে।

১৯৯০ সাল, লোকসভাতে ভিপি সিং সরকারের উপর আস্থাভোট চলছে। বক্তৃতা দিচ্ছেন গীতা মুখোপাধ্যায়। জাতীয় রাজনীতিকে প্রেক্ষিতে রেখে তাঁর নির্বাচনী এলাকা পাঁশকুড়ার একটি সমস্যাকে তিনি তুলে ধরছিলেন সংসদে। আওয়াজ তুলে তাঁর কথা চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিরোধীরা। নেত্রীও ছাড়বার পাত্র নয়। বক্তৃতা সম্পূর্ণ কর তবেই বসলেন গীতাদেবী। এরপরের ঘটনা অবাক করা। যদিও তাদের কাছে এই ঘটনা স্বভাবিক ছিল। বিরোধী বেঞ্চ থেকে নেত্রীর দিকে ছুটে গেলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। গীতাদেবীর পাশে বসে মৃদু স্বরে তাঁকে কিছু বললেন। আস্থা ভোটে পরাজিত হল ভিপি সিং সরকার। জিতল ‘মা’ ‘ছেলে’-র সম্পর্ক।

জানা গিয়েছিল রাজীব পাশে এসে বসে বলেছিলেন , “এতো না চ্যাঁচালেই কি চলছিল না? ভুলে গেছো, কদিন আগে হার্টের বড় সমস্যা ধরা পড়েছে?” ১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসের সেই ঘটনার মাস ছয়েক পরেই রাজীব গান্ধীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা। স্বাভাবিক ভাবেই চোখের জল আটকাতে পারেননি গীতাদেবী।

২১ মে, , শ্রীপেরুমুদুর। রাজধানী মাদ্রাজ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে এক নির্বাচনী প্রচার সভায় গিয়েছিলেন প্রিয়দর্শিনী পুত্র রাজীব। রাত দশটা, বড় রাস্তা থেকে নেমে কাঁচা পথে কিছুটা হাঁটার পর স্থানীয় এক খেলার মাঠে জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। গরম উপেক্ষা করে মানুষের ঢল সভার মাঠে। দুপাশে ভিড়ে ঠাসা মানুষের সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন মঞ্চের দিকে। অনেকে ফুল মালা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছিলেন। এরই মাঝে মালা নিয়ে এগিয়ে আসে এক তরুণী। তাঁকে আটকে রেখেছিল লেডি কনস্টেবল। লেডি কনস্টেবলকে রাজীব ইশারা করে বুঝিয়ে দেন তরুণীকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।

যেন নিজেই নিজের মৃত্যুকে কাছে ডেকে নিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। মেয়েটি মালা পড়ালো তাঁকে। তারপরেই মেয়েটি ঝুঁকে প্রণাম করতে গেল তাকে, আর তখনই তীব্র আওয়াজ আর আলোর ঝলকানিতে ভেসে গেল চারিদিক। সাদা কুর্তা পাজামা পরিহিত নেতার দেহ নিমেষে ছিন্নভিন্ন। তরুণীর দেহ থেকে মাথাটা ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল। রক্তে ভাসল সভার মাঠ। চারিদিকে মৃত দেহের ভিড়, আহতদের আর্তনাদ। প্লাস্টিক বোমায় রাজীবের সঙ্গে আরও চব্বিশ জন মারা গিয়েছিলেন, আহত তিনগুণ। অধিকাংশ সংবাদ সংস্থার হেডলাইন