সাগর: মঙ্গলবার গঙ্গাসাগরের মোক্ষস্নান। স্বাভাবিকভাবে পুণ্য সঞ্চয়ের আশায় লক্ষ লক্ষ মানুষ পায়ে পা মিলিয়ে চলে এসেছে পুণ্যভূমি সাগরে। যে যেখানে আশ্রয় পেয়েছেন বসে পড়েছেন সেখানেই। রাস্তা থেকে অলিগলি, আশ্রম- সব জায়গাতেই মাথা গোঁজার আকুতি।

মাথায় ভারী ভারী লোটাকম্বল নিয়ে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে কালো কালো মাথা। চারপাশে গাড়ির শব্দ, পুলিশের শাসন, ভেসেলে ওঠার দীর্ঘ লাইন, ঠেলাঠেলি, সেদিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। সকলের মন ও চোখে একটাই স্বপ্ন, সাগরসঙ্গমে ডুব দেওয়া।সব জায়গাতে ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই রব। তা নিয়ে পরোয়া নেই কারও।

কুম্ভ মেলাকে টেক্কা দিতে এবারে গঙ্গাসাগরের মেলার বাজেট এক ধাক্কায় অনেকখানি বাড়িয়েছে রাজ্য প্রশাসন। তবে এতে সুরাহা হয়নি। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দিকটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।পুলিশ, সিভিক, স্বেচ্ছাসেবী, কোথাও এতটুকু এ দিক থেকে ও দিক হলেই হাজির।

আরও পড়ুন: কুম্ভর প্রয়াগে আগুন, ভস্মীভূত তাঁবু

রুটিন টহলদারির পাশাপাশি সাগরতটের আনাচ-কানাচ নিয়মিত মেপে নিচ্ছে ড্রোন। সাগর এবং সাগর যাওয়ার পথে বসানো হয়েছে ৮০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। জেলাশাসকের অফিসে মেগা কন্ট্রোলরুম থেকে সেই সিসিটিভি-র ফুটেজ দেখছেন পুলিশকর্তারা। কোথাও কোনও অসঙ্গতি নজরে এলেই ওয়্যারলেসে যাচ্ছে নির্দেশ। কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত যাত্রাপথের বড় অংশই ধরা পড়ছে ওই সিসিটিভিগুলিতে।পুণ্যার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থাও থাকছে।

আরও পড়ুন: শানুর পাড়ায় ঘোঘের বাসা, চামড়া ছেড়ে উধাও বাঘ

তবে রাজ্য সরকারের তৎপরতায় গঙ্গাসাগরে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে বলে মানছেন অনেক পুণ্যার্থীরাই৷ মেলায় আগতদের একাংশ জানান, এককালে এই মেলার সকাল শুরু হত কয় ঘটিকায় স্নান সারতে হবে সেই ঘোষণার মাধ্যমে। এখন আর সেই ঘোষণা নেই। পরিবর্তে কোন শৌচালয় ফাঁকা রয়েছে, কোথায় লম্বা লাইন, বিনামূল্যের শৌচালয় কোথায় সেই ঘোষণা হয়। মেলা প্রাঙ্গণে শৌচালয়ের অভাব ছিল বরাবর। খোলা জায়গায় শৌচকর্ম সারতেন বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু এখন প্রশাসনের তৎপরতায় মেলা প্রাঙ্গণ অনেক বেশি ঝা চকচকে।

এই সব কিছুই আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে গঙ্গাসাগরকে। মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছেন শ্বাশতী চৌধুরী৷ তাঁর কথায়, ‘‘আগে যেরকম নোংরা হয়ে থাকত শৌচালয় এবং রাস্তাঘাটগুলি সেগুলি’’ পুজো দেওয়ার ধরনও। আগে বেশিরভাগ মানুষ নারকেল আর কলা দিয়ে পুজো দিতেন। কিন্তু এখন ডালার দোকান হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে ডালা-অর্কিডের দোকানিদের জন্য পাকা ঘর বানানো হয়েছে।

দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে সস্ত্রীক গঙ্গাসাগরে আসেন কলকাতার বাসিন্দা চঞ্চল মুখোপাধ্যায়। বছর ৬০-এর চঞ্চলবাবু বলেন, ‘‘চোখের সামনে মেলার ভোল বদলাতে দেখলাম। এক-কালে নৌকা ছাড়া অন্য কোনও যানবাহন ছিল না। এখন অনেক উন্নতি হয়েছে৷ আমাদের মতো বুড়ো-বুড়িরাও সহজে আসতে পারছে এখানে৷’ আরও এক পুন্যার্থী কলকাতার বাসিন্দা সুরঞ্জন সেনের বক্তব্য, এক কালে গঙ্গাসাগর মেলায় যে সাধু সন্ন্যাসীদের ভিড় হত এখন তাঁদের সংখ্যাই কমে গিয়েছে।