সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি পদার্থবিজ্ঞানে থার্মাল আয়নাইজেসন তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। তার আবিষ্কৃত সাহা আয়োনাইজেসন সমীকরণ নক্ষত্রের রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মাবলী ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়।পরমাণু বিজ্ঞান, আয়ন মণ্ডল, পঞ্জিকা সংস্কার, বন্যা প্রতিরোধ ও নদী পরিকল্পনা বিষয়ে গবেষণা করেছেন। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। কিন্তু তাঁরও একজন ভগবান দরকার ছিল যে ‘ভগবান’ না থাকলে মেঘনাদ কোনওদিন মেঘনাদ সাহা হতেন না। দোকানে বসে কষতে হত চাল ডাল বিক্রির হিসেব।

‘তুমি না থাকলে দেবদাস কবে হয়ে যেত ক্ষুদিরাম
তুমি না থাকলে শুধু ডানদিক থাকত না কোনো বাম
ধর্মতলায় লেগে যেত রোজ ধর্মের যুদ্ধ
তুমি না থাকলে বেচত বিড়ি গৌতম বুদ্ধ’

অনেকটা সেই অবস্থাই হতে চলেছিল বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর। মুদির দোকানে বসতে হত এবং আরেকটু হলে মুদির দোকানে বসে খাতা লেখার কাজটাইহত তাঁর পেশা। কিন্তু তাঁর জীবনে ভগবান হয়ে এসেছিলেন তাঁর দাদা। আর সেটাই বিজ্ঞানীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মুদির দোকানের হিসেবরক্ষক থেকে হয়ে যান পদার্থবিজ্ঞানে থার্মাল আয়নাইজেসন তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। গল্প হলেও সত্যিটা কেমন ?

অবিভক্ত ভারতের ঢাকার গরীব ঘরে জন্ম তার। বাবার মুদির রয়েছে। সেটাই সংসারের আয়ের রাস্তা। ছয় বছর বয়সে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু পারিবারিক ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছোট মেঘনাদকে বাবা জগন্নাথ সাহা দোকানে নিজের পাশে বসিয়ে কাজও শেখাতে শুরু করেছিলেন।

 

ইচ্ছা না থাকলেও এটা মেঘনাদকে করতেই হত। জগন্নাথ সাহা ভাবতেন তাঁর ছেলেদেরকে এই দোকান চালিয়েই ভরণপোষণ চালাতে হবে। তাই ছেলে যদি স্কুলে সামান্য একটু পড়তে পড়তেই দোকানের হিসাবপত্তর দেখা শোনার কাজ শিখে নেয় তাহলেই ভবিষ্যৎ উজ্বল হবে। মেঘনাদের মন পড়ে থাকত স্কুলের বই আর অংকের খাতায়। কিন্ত কে কার কথা বোঝে। শোনা তো দূরের কথা। স্কুল থেকে এসেই রোজ দোকানে বসতেই হত।

এদিকে মেঘনাদের প্রতিভায় বুঝেছিলেন স্কুলের শিক্ষকেরা। প্রাথমিক স্কুলের পড়াশোনা শেষ হবার পর তাঁরা মেঘনাদের বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন মেঘনাদের লেখাপড়া বন্ধ না করতে। কিন্তু জগন্নাথ সাহা ভাবনা অন্যকিছু ছিল। মনে প্রানে চেয়েছিলেন ঢের হয়েছে এবার এবার ছেলে পুরোপুরি দোকানে বসুক। বড়ছেলে জয়নাথকে হাইস্কুল পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন। তাতে কোনও লাভ হয়নি। উলটে সে ম্যাট্রিকই পাশ করতে পারেনি। এই ম্যাট্রিক ফেল দাদাই মেঘনাদের জীবনে যেন ভগবান হয়ে দাঁড়ান।

ম্যাট্রিক ফেল ছেলে জুট মিলে কাজ করতেন। একমাত্র জয়নাথ বুঝেছিলেন ভাইয়ের মনের কথা। তেরো বছরের বড় দাদা জয়নাথ ভাইয়ের কষ্টে চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি শিমুলিয়া গ্রামে গিয়ে সেখানকার অবস্থাপন্ন কবিরাজ অনন্ত কুমার দাসের হাতে পায়ে ধরে মেঘনাদকে তাঁর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কবিরাজবাবু দয়ালু মানুষ।

মেঘনাদকে বাড়িতে রাখতে রাজী হন। থাকা খাওয়ার জন্য কোন টাকা-পয়সা দিতে হবে না এ কথাও বলে দেন। কৃতজ্ঞ মেঘনাদ দাদার মান রেখেছিলেন। মান রেখেছিলেন কবিরাজ অনন্ত কুমারের। প্রথমে নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষায় সমগ্র ঢাকা জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে সরকার থেকে মাসিক চার টাকা বৃত্তি পেয়েছিলেন মেঘনাদ। আর আপত্তি করননি বাবা।

১৯১১ সালে মেঘনাদ ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। তিনি পদার্থ ও গণিতে সর্বোচ্চ নম্বর লাভ করেন, সার্বিকভাবে তৃতীয়স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯১৩ সাল নাগাদ গণিতে বিএসসি সম্পূর্ণ করেন।

গ্র্যাজুয়েট ছাত্র থেকে পদার্থবিদ হওয়ার পথে তাঁর অবিশ্মরনীয় উন্নতি ঘটে। সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। তাই কলকাতায় বিজ্ঞানের নতুন তথ্য যুক্ত বইগুলি পাওয়া যেতই না প্রায়। সৌভাগ্য, বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের একজন অস্ট্রীয় বিজ্ঞানীর সান্নিধ্যে মেঘনাদ আসতে পেরেছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই তিনি ম্যাক্স প্ল্যাংক রচিত ‘Treatise on Thermodynamics’ এবং ওয়ালথার নার্নস্ট রচিত ‘The New Heat Theorem: Its Foundation in Theory and Experiment’ এর ইংরেজি অনুবাদগুলি পেয়েছিলেন।

এছাড়া তিনি প্রফুল্ল চন্দ্র রচিত ‘A History of Hindu Chemistry from the Earliest Times to the Middle of the Sixteenth Century A. D’ বইটি পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এর বাইরেও নিলস বোর এবং আরনল্ড সমারফেল্ডের কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত তত্ত্ব সম্বন্ধে তিনি পড়াশোনা করেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকার সময়েই মেঘনাদ সাহা অস্ট্রিয়া ফেরত এক রসায়নবিদের কাছ থেকে জার্মান শিখেছিলেন। এটাকেই কাজে লাগিয়ে ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন তখন সত্যেন্দ্রনাথ বোসকে সঙ্গে নিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন এবং হারম্যান মিনকোস্কির লেখা আপেক্ষিকতার গবেষনাপত্রটি জার্মান ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সারা বিশ্ব সেই প্রথমবার আপেক্ষিকতার গবেষনাপত্রটি ইংরেজিতে পড়ার সুযোগ পায়।

একই বছর মেঘনাদ সাহা চিরায়ত বিভিন্ন জোতিঃপদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ের সমস্যা যেমন: সৌর উদগীরন, করোনা, এবং বিশেষ করে ধুমকেতুর লেজ সর্বদা সুর্যের বিপরীতে অবস্থান করার ঘটনা ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেন।

১৯১৯ সালে সাহা “On selective radiation pressure and its application,” নামে Americal Astrophysical Journal এ একটি গবেষনাপত্র প্রকাশ করেন সেখানে তাঁর বিখ্যাত “সাহা সমীকরণ” প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর তাঁর তাপীয় আয়নীকরণ তত্ত্ব সুর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্রের আভ্যন্তরীন ক্রিয়া, রাসায়নিক গঠন, মৌল ঘনমাত্রা এবং পৃষ্ঠীয় মধ্যাকর্ষন সম্বন্ধে নতুন দিক নির্দেশনা দেয়। এই সময়ে তিনি আলোর কোয়ান্টাম তত্ব এবং নীলস বোরের পারমাণবিক তত্ত্বের মাধ্যমে দেখান যে নাক্ষত্রিক পরমাণুসমূহের বিকর্ষন বল অনুভব করার জন্য বিকিরণ চাপ দায়ী।

তাঁর তত্ত্ব থেকে অনুমান করা যায়, মৌলের কিছু বর্ণালী রেখা কেবল মাত্র নক্ষত্রের নিন্ম তাপমাত্রা এলাকাতেই পাওয়া যেতে পারে। তিনি একই সাথে তাঁর বিখ্যাত সমীকরণপ্রতিপাদন করেন। এটি জোতিঃপদার্থবিদ্যার বর্ণালীর সমীকরণ যা থেকে কোনো মৌলের আয়নীকরণ মাত্রা গননা করা যায়।

আলোক তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এধরনের বিভিন্ন বিষয়ে নানাবিধ ত্রুটি দেখা যাচ্ছিল সেই সময়। তিনি জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের আলোর তীব্রতা ও চাপসংক্রান্ত ফলাফলের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি দেখতে পেলেন ম্যাক্সওয়েলের ফলাফল কেবল সেসব বস্তুর জন্য প্রযোজ্য হয় যেগুলোর প্রতিবন্ধক বস্তুটির মাত্রা আরোপিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি হয়। যেহেতু পরমানুর ব্যাস আলোক তরঙ্গের চেয়ে ক্ষুদ্র তাই এরা কোনো বিকিরণ চাপ অনুভব করে না এবং এই কারণে এই ফলাফলের মাধ্যমে ধুমকেতুর লেজের সূর্যের বিপরীত দিকমুখীতার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।

১৯২১ সালে বার্লিনে মেঘনাদ সাহা শক্তি এবং ভরবেগের অবতারণা করে ধুমকেতুর এই আচরণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেছিলেন, “আলোর কোয়ান্টা পরমাণুতে চাপ প্রয়োগ করবে যদি পরমাণুটি বিকিরণটিকে শোষন করতে পারে।” উদাহরণস্বরূপ, তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন হাইড্রোজেন আলফা লাইনের আলোর একটি পালস শোষন করলে একটি হাইড্রোজেন পরমাণু এক সেকেন্ডে ৬০ সেন্টিমিটার গতি লাভ করতে পারে।

সাহা কয়েকবছরের মধ্যে আলোর পালস এবং শক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কম্পটন প্রভাব অনুমান করেন। ইউরোপের অনেক পদার্থবিদ কম্পটন প্রভাব সম্বন্ধে জানার আগে আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিষয়ে সংশয়গ্রস্থ ছিলেন, তাঁর এই আবিষ্কার পদার্থ বিজ্ঞানে তাই যুগান্তকারী হিসেবেই দেখা হয়।

তথ্যসূত্র- ‎Pratap C Saha‎ এবং মেঘনাদ সাহা – শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় এবং এনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় – NATIONAL BOOK TRUST