মৌমিতা পোদ্দার: গোটা বিশ্বের ত্রাস করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারে নয়া ইতিহাস গড়ার মুখে ভারত। যার ফলে বিশ্ব জুড়ে করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গেল আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা।

চলতি জুলাই মাসেই ‘ভারত বায়োটেকের’ তৈরি ‘কোভ্যাক্সিন’ টিকা মানবদেহে ট্রায়াল শুরু হচ্ছে। মোট দু দফায় চলবে এই পরীক্ষা। ছাড়পত্র মিলেছে ডিসিজিআই এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের।

হায়দরাবাদের ওষুধ প্রস্তুকারক সংস্থা ভারত বায়োটেককে এই কাজে যৌথভাবে সহায়তা করেছে আইসিএমআর। গত সোমবার করোনার টিকা আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেন ভারত বায়োটেকের চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডঃ কৃষ্ণ ইল্লা।

কিন্তু কে এই ডঃ কৃষ্ণ ইল্লা? যার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারে আশার আলো দেখছে ভারত। তিনি আর কেউ নন তামিলনাড়ুর তিরুথানির বাসিন্দা এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। ছোটোবেলা থেকেই পড়াশুনোর প্রতি আগ্রহী এবং মেধাবী ছিলেন তিনি। ফলে অভাব অনটনের সংসারে জন্মেও নিজের ইচ্ছায় আজ তিনি এতদূর পৌঁছতে পেরেছেন। তাঁর সাফল্যে আজ গর্বিত গোটা দেশ।

তিনি জানিয়েছেন, পড়াশোনা শেষ করে আর পাঁচটা সন্তানের মতো তাঁরও ইচ্ছা ছিল বাবার কাজে সহযোগিতা করার। কীভাবে জমিতে ফলন আরও বাড়ানো যায়,ফসলের যত্ন নেওয়া প্রভৃতি বিষয়েই তাঁর ছোটো থেকেই আগ্রহ ছিল। পড়াশোনাও করেছিলেন কৃষিবিদ্যা নিয়ে। তবে বিধাতা হয়ত চাননি তিনি কৃষিবিদ হোন। ফলে সংসারে চাপে কলেজ শেষের পর একটি ওষুধ প্রস্তুকারক সংস্থায় সহকারী কর্মী হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানে অবশ্য তাঁকে কৃষি বিষয়ক জিনিস দেখভাল করতে হত।

তিনি আরও জানিয়েছেন, ওই কোম্পানিতে কাজ করতে করতে স্কলারশিপ পান তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বিদেশ চলে যান।

আমেরিকা গিয়ে সেখানকার হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথমে মাস্টার্স এবং ইউনিভার্সিটি অফ উইসকন-ম্যাডিসন থেকে পিএচইডি শেষ করেন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি নিজের দেশে ফিরে আসেন। যদিও সেভাবে ভারতে আসার কোনও ইচ্ছায় ছিল না তাঁর।

এই বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “দেশে ফেরার আগে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে এরপর আমি কী করব? আমার কী ইচ্ছা।”

তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত মায়ের ইচ্ছাতেই দেশে ফেরা তাঁর। দেশে ফিরে নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় মও হয়ে যান তিনি।

জানা গিয়েছে, সেই সময় দেশে হেপাটাইটিস ভাইরাস ঘটিত রোগের টিকার খুব চাহিদা ছিল।

ঠিক সেই সময় তিনি হায়দরাবাদে একটি ল্যাব তৈরী করে সেখানেই মেডিকেলের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা গবেষনা চলত। আর সেখান থেকেই পথচলা শুরু ‘ভারত বায়োটেক’ কোম্পানির। এরপর তাদের কোম্পানি হেপাটাইটিস রোগের টিকা আবিষ্কারের প্রস্তাব দেয় সরকারকে। সেইমত। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খরচ হিসেবে ধরা হয়েছিল ১২.৫ কোটি। যা পরে বাজারজাত করার সময় ৩৫থেকে ৪০ ডলারে বিক্রি করা হয়েছিল।

যদিও সেইসময় এতগুলো টাকা একসঙ্গে জোগার করা খুব একটা সহজ কাজ ছিলো না। কোনও ব্যাংক ঋণ দিতেও চাইছিল না। এই অবস্থায় ভারত বায়োটেকের পাশে এসে দাঁড়ায় আইডিবিআই ব্যাংক। তারা ২কোটি টাকা দিয়ে ভারত বায়োটেককে হেপাটাইটিস এর টিকা আবিষ্কারে সাহায্য করে।

আর এর প্রায় চার বছর পর হেপাটাইটিস এর টিকা আবিষ্কারে সফলতা লাভ করে ভারত বায়োটেক কোম্পানি। যা ১৯৯৯ সালে দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি স্যার এপিজে আবদুল কালামের হাত ধরে প্রথম বাজারে লঞ্চ করে।

এরপর সারাদেশে প্রায় ৩৫মিলিয়ন ওষুধ সরবরাহ করা হয় এবং ধীরে-ধীরে পৃথিবীর প্রায় ৬৫ টি দেশে হেপাটাইটিস রোগের টিকা রফতানি করা হয়। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০মিলিয়ন ডোজ।

এরপর ধীরে-ধীরে ভারত বায়োটেক পোলিও, র্যাবিস,জিকা,এইচ১এন১,রোটা, চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস ঘটিত রোগের টিকা আবিষ্কারে সাফল্য পায়।

তাঁর সংস্থার অসাম্য সাফল্যে গর্বিত হয় অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। আর এরপর ডঃ কৃষ্ণ অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর কাছে গিয়ে হায়দরাবাদ শহরে একটি বায়োটেক নলেজ পার্ক গড়ার প্রস্তাব দেন। তাঁর সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান চন্দ্রবাবু। এরপর সেখানে গড়ে হয়ে একটি বিশাল বায়োটেক পার্ক। যার নাম দেওয়া হয় জিনোম ভ্যালি।

তিনি আরও বলেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কার সহ নানাধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং গবেষণার কাজে জিনোম ভ্যালির অবদান রয়েছে প্রচুর। পরবর্তীকালে এই জিনোম ভ্যালির অনুকরণে বেঙ্গালুরু এবং পুনেতে একটি বায়োটেক পার্ক তৈরী করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রোগের টিকা আবিষ্কারে অসামান্য সাফল্য লাভ করা ডঃ কৃষ্ণ ইল্লাকে ২০১৩ সালে আমেরিকার উইস্কন ইউনিভার্সিটি থেকে ‘বায়ো স্পেকট্রাম পার্সন’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। এছাড়াও ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বেস্ট টেকনোলজিস্ট অ্যাওয়ার্ডসে ভূষিত হন।

তবে বর্তমান মারণ ব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিষয়ে তিনি বলেন,” করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা ভ্যাকসিন তৈরীর প্রকল্প হাতে নেয়। কোনওরকম ঢাকঢোল না পিটিয়েই নিশব্দে কাজ শুরু করে দেন বিজ্ঞানীরা।”

জানা গিয়েছে, প্রথমে সার্স-কোভ-২ স্ট্রেইনটি পুনের এনআইভিতে বিছিন্ন করার পর ভারত বায়োটেকে পাঠানো হয়েছিল। ওই স্ট্রেইনটি হায়দরাবাদের জিনোম ভ্যালিতে অবস্থিত ভারত বায়োটেকের বায়ো সেফটি লেভেল-৩ পরীক্ষাগারে তৈরী হয়েছে এই টিকা। মানুষের দেহে সেটি প্রবেশের আগে প্রি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাও করা হয়েছিল।এরপরই তা স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ডিসিজিআই এর কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই মানব শরীরে এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি মেলে।

ভারত বায়োটেকের আশা,’কোভাক্সিন’ আবিষ্কারে সাফল্য পেলে বিশ্ব দরবারে ভারতের মুকুটে যুক্ত হবে আরও একটি নতুন পালক। আবারও নতুন মাইল ফলক তৈরী করবে ভারত। আশাবাদী সকলেই।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ