কলকাতা: সিনেমাতেই এমন হয়ে থাকে। প্রেমের মাস সাক্ষী থাকল এক অসামান্য প্রেমের গল্পে। টিন্ডার ও ভার্চুয়াল প্রেমের যুগেও যে লড়াই করে এভাবে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সারাজীবন থাকার অঙ্গীকার করা যায় তা দেখিয়ে দিলেন বাংলারই এক দম্পতি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দেহব্যবসাকে সব সময়ে নীচু চোখে দেখা হয়। কোনও মহিলাকে অপমান করতে হলেও বেশ্যা, যৌনকর্মী বলে আক্রমণ করতে হয়। কিন্তু ব্যতিক্রম হয়েই থাকে।

সুলেখাও (স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রদত্ত নাম) একসময়ে দেহব্যবসায় আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। জোর করেই তাঁকে এই পেশায় আনা হয়েছিল। অপহরণ করে তাঁকে যৌনপল্লিতে নিয়ে আসা হয়েছিস। খদ্দের ও দালালদের হাতে অত্যাচারিত হয়েছেন। কিন্তু এসবের কথা মাথায় না রেখেই সারাজীবনের জন্য সুলেখার হাত ধরেছেন সুজয় (নাম পরিবর্তিত)।

সুলেখা ও তাঁর পরিবার হলদিরামের বাসিন্দা। মুড়ির দোকান দিয়েই সংসার চলত তাঁদের। কিন্তু ১৫ বছর বয়সে তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেন তাঁরই ঠাকুমা। সুলেখার বাবার মৃ্ত্যু হয়েছে অনেকদিন আগেই। অসহায়মা-ও সেদিন বাধা দিতে পারেননি। এর পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেচেদা রেলস্টেশনে চলে যান সুলেখা। সুলেখার কথায়, “আমি স্টেশনে বসে কাজ দেওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইছিলাম। সেই সময়ে দুজন লোক এসে বলে, একটা বাড়িতে কাজ আছে। ওরা আমায় টাকাও দেবে, খেতেও দেবে। আমি রাজি হয়ে যাই। ওরা আমায় খেতে দেয় তখন। তার পরে যখন চোখ খুলি, আমি তখন যৌনপল্লীতে। ওখানকার মালিক আমায় খুব মারধর করে আর জোর করে দেহব্যবসায় যোগ দিতে বাধ্য করে। আমি অনেকবার পালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু প্রতিবারই ধরা পড়ে যাই।”

এরপরে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হয়ে পুলিশ ওই যৌনপল্লীতে তল্লাসি চালায়। পাচার হওয়া মেয়েদের উদ্ধার করে রিহ্যাবে পাঠায় ওই সংস্থা। সেখানে ছিলেন সুলেখাও। তখন সুলেখার ১৮ বছর বয়স হবে। এর পরে তাঁকে নরেন্দ্রপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পার্কস্ট্রিটের একটি বেকরিতে তাঁকে কেক তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

সুলেখা বলছেন, “আমি কেক বানানো শিখে গিয়েছিলাম। কিন্তু কসবায় একটি ব্যাগ সেলাইয়ের দোকানের মালিকের প্রেমে পড়েছিলাম। তিনিই বলেছিলেন তাঁর সংস্থায় যোগ দিতে। তিনি আমার খুব খেয়াল রাখতেন। তার পরে একদিন বিয়ের জন্য প্রস্তাব দেন। আমি আমার অতীত ওর থেকে লুকোইনি। আমি নিজেকে মাঝেমধ্যে চিমটি কেটে দেখি আমি স্বপ্ন দেখছি কি না।”

তবে শুধু সুলেখাকে বিয়ে করাই নয়। সুলেখার স্বপ্নও সত্যি করতে চান সুজয়। তাই এখন থেকেই টাকা জমাচ্ছেন তিনি। কারণ সুলেখার কেক বানানোর স্বপ্ন পূরণ করতে চান তিনি।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মুখপাত্র বলছেন, এই প্রথম দেখলাম একজন উদ্ধারপ্রাপ্ত মেয়ে তাঁর আসল পরিচয় প্রকাশ করার পরেও কেউ তাঁকে বিয়ে করল। আমাদের মিশন স্বার্থক বলেই মনে হচ্ছে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ