সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ওঁরাই ঈশ্বরের প্রিয় সন্তান। মহাদেবের বাসভূমি হিলাময়ের কোলেই ওদের আদি বাসস্থান। প্রাচীন ভারতের জনজাতিগুলির মধ্যে তাঁরা অন্যতম। আজ তারাই কোথাও হারিয়ে যাওয়ার মুখে বসে রয়েছেন। ওঁরা লেপচা।

লেপচাদের আদি বাসভূমি সিকিম। তাঁরা নিজেদের বলেন ‘মূতাঞ্চেয়ি রঙ্কুপ রাম কাপ’ অর্থাৎ ‘প্রকৃতি মাতা এবং ঈশ্বরের প্রিয় সন্তান’। তবে তাঁরা নিজেদের কখনও লেপচা বলে সম্বোধন করেন না। তাঁদের এই নামের উৎপত্তি নেপালিদের দেওয়া নাম থেকে। আসলে যেটা জানা যায় ‘লাপচা’ একটি পার্বত্য মাছের নাম। এই মাছ অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। লেপচারাও অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। সেই জন্যই নেপালিরা লেপচাদের ‘লাপচা’ বলতেন। এটা অপভ্রংশ হয়ে ‘লেপচা’ হয়ে যায়।

সিকিমের ইতিহাস ঘেঁটেও এখনও জানা যায়নি ঈশ্বরের প্রিয় সন্তানদের জনজাতি ঠিক কত বছরের পুরনো। তবে এইটুকু জানা যায় যে, একসময় দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি তরাই অঞ্চলের অধিকাংশই সিকিম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার অর্থ ও সন্ধির মাধ্যমে কিছু অংশ অধিকার করেছিল।

দার্জিলিং একসময় সিকিমের অংশ ছিল। সিকিমের সঙ্গে নেপালের সবসময় দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। সিকিমের দার্জিলিং অংশ দিয়ে নেপাল এবং ভুটানের সীমান্ত আলাদা করা ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত সিকিম রাজ্য দ্বারা দার্জিলিং সংলগ্ন পাহাড়ী অঞ্চল এবং নেপাল রাজ্য দ্বারা শিলিগুড়ি সংলগ্ন তরাই সমতল অঞ্চল শাসিত হত। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে নেপালের গোর্খারা সমগ্র পাহাড়ী অঞ্চল অধিকারের চেষ্টা শুরু করলে সিকিমের রাজা তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

গোর্খাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে এঁটে উঠতে না পেরে সিকিম সেনাবাহিনী একটা পর্যায়ে তিস্তা নদীর তীর পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। শেষে সিকিমের রাজা ব্রিটিশদের সহায়তা নেন। ব্রিটিশরাও নেপালিদের এমন জয় যাত্রায় যথেষ্ট চাপের মধ্যে পরে গিয়েছিল। নেপালিদের রুখতে ব্রিটিশরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত ইঙ্গ-গোর্খা যুদ্ধে গোর্খারা হেরে যায়।

১৮১৫-তে স্বাক্ষরিত হয় সগৌলি চুক্তি। এই চুক্তির ফলে নেপাল তার ভূমির এক তৃতীয়াংশ মালিকানা হারায় এবং সিকিম রাজ্য থেকে অধিকৃত মেচী নদী থেকে তিস্তা নদী পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অতঃপর দার্জিলিং ভারতের দিকে চলে আসে। এবং লেপচারাও হয়ে যায় ভারতের এই অংশেরই বাসিন্দা। পরে যত সময় এগোয় তত নেপালিদের প্রভাব বাড়তে শুরু করে দার্জিলিং এবং তার আশেপাশের এলাকাগুলিতে। চা বাগানে কাজ করতে শুরু করে। শান্তি প্রিয় ঈশ্বরের সন্তানরা ঝামেলা না বাড়িয়ে ক্রমে দূরে সরে যেতে শুরু করে।

লেপচারা কৃষিজীবী। অর্থের বিনিময়ে জমির স্বত্ব পরিত্যাগ করে তারা। এবং লেপচারা ভূমিহীন হয়ে পড়ে। বর্তমানে ক্ষেত শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন অধিকাংশ লেপচারা। এখন শহর এলাকায় যেসব লেপচাদের চোখে পড়ে তাদের অধীকাংশই নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়েছেন। এখন লেপচা উপজাতি পশ্চিমবাংলার তফসিলী আদিবাসী সম্প্রদায়ভূক্ত।

লেপচাদের আদি কৃষ্টি ও সংস্কৃতি এখনও বেঁচে আছে বন-জঙ্গল অধ্যুষিত পাহাড়ি গ্রামে গ্রামান্তরে। লেপচাদের কোমরে ঝোলানো থাকে লোহার তৈরী অস্ত্র, লেপচা ভাষায় এর নাম ‘বমপক’। অস্ত্রটি এদের নিত্যসঙ্গী। অবশ্য এখন এই অস্ত্র শুধু রয়ে গিয়েছে লেপচাদের ঐতিহ্য হিসাবে। বিশেষ ব্যবহার নেই। কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতীক হিসাবে এরা ছোট-বড় পাথরের সাহায্যে স্তুপ তৈরী করে উপাসনা করে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং, কালিম্পঙ ও সদর মহকুমায়। সিকিমেও কিছু লেপচার থাকেন। লেপচাদের বসতি রয়েছে নেপালের ইলাম প্রদেশের তরাই অঞ্চলে, ভুটানের সার্বঙ, গ্যালিফো, ফুন্টসিলিং অঞ্চলে। সেই লেপচাদের স্টল ছিল ৪৩তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নামাঙ্কিত এক নম্বর হলের মধ্যেই নিজেদের সংস্কৃতির পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন তাঁরা। উপস্থিত ছিলেন তাঁদের পরিচিত পোশাকেই।