বিভাস ভট্টাচার্য, কলকাতা: শিশু পাচার চক্রের তদন্তে নেমে এবার এক নাবালিকার সন্ধান পেল সিআইডি৷ গত বছর এই মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে সে এই হোমের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে৷ মেয়েটির সমস্যা দূরীকরণের নামে হোম আধিকারিকরা এই মেয়েটির প্রসব করা শিশুটিকে নিয়ে নেয়৷ পাশাপাশি এই মেয়েটির থেকে মুচলেখা নিয়ে নেয় যে ভবিষ্যতে সে কোনওদিন এই শিশুটিকে নিজের বলে দাবী করতে পারবে না৷ বুধবার আদালতের কাছে এই মেয়েটি গোটা ঘটনাটি খুলে বলবে৷

আরও পড়ুন : কলকাতার পরে শিশুপাচারে যোগ মিলল জলপাইগুড়ির বিজেপি নেত্রীর

সিআইডি-র এক আধিকারিক জানান, ‘‘আদালতের কাছে মেয়েটির এই গোপন জবানবন্দী আমাদের এই কেসের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ পাশাপাশি আমরা বেশ কিছু দম্পতির সন্ধান পেয়েছি যারা এই হোম থেকে টাকার বিনিময়ে শিশু দত্তক নিয়েছিলেন৷ এই দম্পতিদের জবানবন্দীও এই মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷’’ অন্যদিকে মঙ্গলবার হোমটির একটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে সিআইডি৷ গাড়িটির সামনে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিচয় সম্পন্ন একটি ভুয়ো নেমপ্লেট লাগানা ছিল৷

আরও পড়ুন : ‘শিশুপাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে জুহির পাশে নেই দল’

এর আগে উত্তর ২৪ পরগনার বাদুরিয়ে থেকে যখন আরেকটি শিশু পাচার চক্রের চাঁইদের গ্রেফতার করেছিল সিআইডি তখন একটি নার্সিং হোম থেকে তিনটি সদ্যজাত শিশু উদ্ধার করেছিল সিআইডি৷ পরবর্তীকালে কলকাতার কাছে একটি হোম থেকে আরও ১০টি শিশু উদ্ধার করে সিআইডি-র আধিকারিকরা৷ যাদেরকে অত্যন্ত অসাস্থ্যকর পরিবেশে রেখে দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু এবার এখনও পর্যন্ত কোনও শিশুকে উদ্ধার করতে পারেনি সিআইডি৷ আদালতে তাই ভরসা এই সাক্ষীরা৷

আরও পড়ুন : টাকা দিয়ে শিশুর জন্য অপেক্ষা করছেন নি:সন্তান দম্পতিরা

সিআইডি-র এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘আমাদের হাতে আপাতত প্রমাণ বলতে আছে ওই নাবালিকা সহ এই ধরনের কিছু দম্পতি এবং অভিযুক্তদের নিজেদের মধ্যে এ সংক্রান্ত বিষয়ে নানানরকম কথোপকথনের রেকর্ড৷ পাশাপাশি অভিযুক্তদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া দত্তক সংক্রান্ত নানানরকম কাগজপত্র৷ যদিও চন্দনা এবং তার সহযোগী ইতিমধ্যেই আমাদের কাছে এ বিষয়ে তাদের যুক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন, কিন্তু এই স্বীকারোক্তি আদালতগ্রাহ্য নয়৷ আপাতত তাই আমাদের জোর দিতে হচ্ছে ওই ক্রেতাদের সহযোগীতার ওপর যারা টাকার বিনিময়ে শিশু দত্তক নিয়েছিল৷’’
তদন্তে নেমে সিআইডি-র আধিকারিকরা দেখেন, মোটা টাকার বিনিময়ে এই শিশুদের বিক্রি করেছে হোম আধিকারিকরা৷ যার থেকে যেমন পেরেছে সেরকম নিয়েছে৷ দত্তক সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রায় কিছুই দেওয়া হয়নি এদের৷ আর যেটুকু দেওয়া হয়েছে সেটাও জাল৷ তদন্তে নেমে সিআইডি-র ধারনা আশেপাশের কয়েকটি হোমের সঙ্গে এই হোমটির আধিকারিকদের যোগাযোগ ছিল৷ প্রয়োজনমতো সেখান থেকেও শিশু সংগ্রহ করা হত বলে সিআইডি-র অনুমান৷

আরও পড়ুন : বিদেশে ১০-৪০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছে, জলপাইগুড়ির হোম থেকে ১৫ বছরে পাচার প্রায় ৩০০ শিশু

তবে সিআইডি-র হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হোমের আধিকারিক চন্দনা  চক্রবর্তী তদন্তের কাজে সিআইডি আধিকারিকদের সাহায্য করছেন বলেই সিআইডি আধিকারিকরা জানিয়েছেন৷  এক তদন্তকারী অফিসারের বক্তব্য, ‘‘প্রথমদিকে চন্দনা কিছুটা অস্বীকার করলেও এখন তদন্তের কাজে আমাদের সহযোগীতা করছেন৷ জুহি চৌধুরি-র সঙ্গে তার এবং এই হোমটির কিভাবে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল সে বিষয়ে মোটামুটি প্রায় পুরোটাই আমাদের জানিয়েছে চন্দনা৷ পাশাপাশি এ ব্যাপারে কিছু কিছু সরকারি আধিকারিকের ভূমিকাও আমাদের কাছে জানিয়েছেন তিনি৷ যদিও আমরা পুরোটাই খোঁজ নিয়ে দেখছি৷’’

গত কয়েকদিন ধরে তদন্ত চালিয়ে সিআইডি-র আধিকারিকরা নিশ্চিন্ত যে জলপাইগুড়ি শহরের আশেপাশে কিছু কিছু নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের কাছেও এ ব্যাপারে কিছু খবর থাকত৷ কারন চন্দনা তাদেরকে জানিয়েছেন যে কিছু কিছু নার্সিংহোমের যোগসাজসেও তারা শিশু যোগাড় করেছিলেন৷ এর সঙ্গে নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত কিছু কিছু ডাক্তারের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিআইডি আধিকারিকরা৷ পাশাপাশি জানা গিয়েছে, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের একটি হোম থেকে এক শিশুকে বিদেশে পাচার করার ব্যাপারে তলে তলে তৈরি হচ্ছিল জলপাইগুড়ির ওই হোমের আধিকারিকরা৷ কিন্তু, সিআইডির তৎপরতায় তা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়৷  সিআইডি-র এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এ ব্যাপারে আমরা কিছু কিছু ডাক্তারের খোঁজ পেয়েছি৷ তাঁদের নামের এক তালিকা তৈরি করে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ভাবা হচ্ছে৷’’
সিআইডি সূত্রে জানা গিয়েছে ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই সক্রিয় হয়ে ওঠে জুহি৷ বিজেপি পরিবারে জন্ম হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই তার সঙ্গে বেশ কিছু বিজেপি-র লোকজনের সঙ্গে আলাপ ছিল৷ পরবর্তীকালে জুহি চেষ্টা করতে থাকে দিল্লিতে যোগাযোগ তৈরি করবার৷

সিআইডি আধিকারিকের কথা অনুযায়ী, ‘‘এই ধরনের হোমগুলি চালাতে গেলে কেন্দ্রীয় স্তরে যোগাযোগ থাকলে অনেক সুবিধা হয়৷ কারন হোম চালানোর জন্য যে অনুদানের প্রয়োজন হয়, তার সিংহভাগটাই আসে দিল্লি থেকে৷ পাশাপাশি দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে স্থানীয় প্রশাসনকও একটা চাপে রাখা যায়৷ এত কিছু চিন্তা করেই জুহির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন চন্দনা৷ পাশাপাশি জুহিও এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করে রোজগারের মাধ্যম হিসেবে তার এই জোগাযোগগুলো কাজে লাগাতে৷ পাশাপাশি সে তৈরি হতে থাকে আগামীদিনে নিজেই একটা এই ধরনের হোম তৈরি করে বাচ্চা দত্তকের ব্যবসা শুরু করতে৷’’